মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের বারুদে ভারি, ঠিক তখনই ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানল ইসরায়েল। রোববার দিবাগত রাতে ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন কারখানায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী (আইডিএফ)। তেল আবিবের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে তারা ৮০টিরও বেশি শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করেছে, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সোমবার এক বিবৃতিতে এই অভিযানের বিস্তারিত প্রকাশ করে। তারা জানায়, এবারের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের অত্যন্ত স্পর্শকাতর কিছু সামরিক স্থাপনা। এর মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল অ্যাসেম্বলি সেন্টার, যা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ট্যাংকবিধ্বংসী ও বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাগুলোতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হামলাটি চালানো হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই কমপ্লেক্সটি ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেইনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুনরুদ্ধার করতে তেহরানকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হবে।
আইডিএফ-এর তথ্যসূত্র বলছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তারা ইরানের সামরিক শিল্পের ওপর হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেবল গত দুই দিনেই ইরানের প্রায় ৪০টি কৌশলগত স্থাপনাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরাইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে যা ইরানের রাডার ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। অন্যদিকে, তেহরান এই হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখছে। যদিও প্রাথমিক তথ্যে বেশ কিছু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি।
এই সামরিক অভিযান এমন এক সময়ে ঘটল যখন ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে শাসন পরিবর্তনের দাবি তুলে শান্তির আশাবাদ ব্যক্ত করছেন, অন্যদিকে তার প্রধান মিত্র ইসরায়েল একের পর এক বোমা বর্ষণ করে তেহরানকে কোণঠাসা করার নীতি বজায় রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের অস্ত্র কারখানায় এই ভয়াবহ হামলা কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও বটে। এর মাধ্যমে ইসরায়েল প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা ইরানের যেকোনো সুরক্ষিত স্থাপনায় পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখে। এই সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়বে নাকি তেহরান পিছু হটবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বনেতারা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন, কারণ ইরানের অভ্যন্তরে এই মাত্রার হামলা বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করতে পারে। আপাতত ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরানের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা চাপা পড়ল, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

