আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত এক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইরানে কার্যত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে গেছে। তেহরানের পূর্ববর্তী নেতৃত্ব এখন ইতিহাস, আর বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি গভীর আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ চড়ে সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করেন। তার দীর্ঘদিনের আক্রমণাত্মক অবস্থানের তুলনায় এবারের বক্তব্যে কিছুটা নমনীয়তা এবং কূটনীতির সুর লক্ষ্য করা গেছে।
ট্রাম্প সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে ইরানে সরকার পরিবর্তন করে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। আপনারা যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন ইরানের সেই পুরনো শাসন কাঠামো আজ আর নেই; তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যারা একসময় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করত, তারা আজ মৃত।”
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার ভয়াবহ সংঘাতের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে। যুদ্ধের শুরুর দিনেই ইসরায়েলি ও মার্কিন যৌথ হামলায় নিহত হন ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেই একই হামলায় খামেনির স্ত্রী, কন্যা এবং নাতিসহ পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান।
তবে ট্রাম্পের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন এখন তেহরানের এমন একদল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, যাদের সঙ্গে অতীতে কখনোই কোনো পশ্চিমা দেশ কাজ করেনি। ট্রাম্পের মতে, এই নতুন নেতৃত্ব আগের তুলনায় অনেক বেশি ‘যুক্তিসঙ্গত’ এবং বাস্তববাদী।
“তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একদল মানুষ,” উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, “আমি বিষয়টিকে কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং একটি আমূল শাসন পরিবর্তন হিসেবেই দেখছি। সবচেয়ে আশার কথা হলো, তারা আলোচনার টেবিলে খুবই ইতিবাচক আচরণ করছে। আমি প্রায় নিশ্চিত যে খুব দ্রুতই আমরা একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারব।”
ইরানের এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক অস্থিরতা। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় তার ছেলে মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাকেই দ্রুততম সময়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা ছিল।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করেছিল মোজতবা খামেনি শয্যাশায়ী এবং তার বেঁচে থাকা অনিশ্চিত। কিন্তু তেহরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, মোজতবা খামেনির পায়ে আঘাত লাগলেও তা প্রাণঘাতী ছিল না। যুদ্ধের ১২তম দিনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ আমন্ত্রণে তাকে মস্কোয় সরিয়ে নেওয়া হয়।
বর্তমানে মোজতবা খামেনি মস্কোর একটি সুরক্ষিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি তার বিশ্বস্ত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের ‘ভিন্ন একদল মানুষ’ বলতে মোজতবার অনুগত এই নতুন কর্মকর্তাদের বোঝানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।
ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে পুরনো রক্ষণশীল নেতাদের প্রস্থান এই পরিবর্তনের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌর এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী লারিজানিসহ প্রায় বিশজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত এক মাসের যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এই শূন্যতা পূরণে যারা এগিয়ে এসেছেন, তারা পশ্চিমের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার এই পরমাণু শক্তিধর দেশটি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের শান্তি সংলাপ শুরু হতে যাচ্ছে।
ইসলামাবাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের কথাতেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বারবার জোর দিচ্ছেন যে, ইরান এখন আর আগের মতো অনমনীয় অবস্থানে নেই। ইরানের সাধারণ মানুষও বছরের পর বছর চলতে থাকা নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি চায়, যা নতুন নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই দাবি যদি সত্যি হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বিজয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, রাশিয়ার মাটিতে বসে মোজতবা খামেনি কতটা স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। মস্কোর প্রভাব বলয় ডিঙিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা তেহরানের জন্য যেমন কঠিন, তেমনি ট্রাম্পের জন্যও এটি একটি অগ্নিপরীক্ষা।
ইরানের রাজপথে এখন নিস্তব্ধতা, কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে ক্ষমতার তীব্র মেরুকরণ। পুরনো বিপ্লবী আদর্শের চেয়ে এখন টিকে থাকার লড়াইটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের সাধারণ নাগরিকরা এখন কেবল আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি আর যুদ্ধের দামামা থেকে রেহাই চায়।
ট্রাম্পের এই ‘সরকার পরিবর্তন’ এবং ‘সমঝোতার নিশ্চয়তা’ যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র চিরতরে বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ চার দশকের শত্রুতা কাটিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে? নাকি এটি ট্রাম্পের স্বভাবজাত কোনো রাজনৈতিক স্ট্যান্ট, তা সময়ই বলে দেবে।
আপাতত বিশ্ববাসীর নজর এখন ইসলামাবাদের শান্তি সংলাপের দিকে। সেখান থেকে আসা সামান্যতম সংকেতও নির্ধারণ করে দেবে আগামী দিনের তেলের বাজার এবং বিশ্ব নিরাপত্তার গতিপথ। রক্তক্ষয়ী এক মাসের পর ইরান এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে একদিকে রয়েছে ধ্বংসের স্মৃতি, অন্যদিকে শান্তির অস্পষ্ট সম্ভাবনা।


1 Comment
Yo, check out bets81! Been having some decent luck there lately. Good vibes and solid selection. Give it a whirl! bets81