মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আগুনের গোলকায় ঢাকা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। শনিবার মধ্যরাতের পর থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু ও জনবসতি লক্ষ্য করে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ আজ রোববার (২৯ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত অন্তত পাঁচ দফায় বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তবে সর্বশেষ রোববার দুপুরের হামলায় এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি ভূখণ্ডে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
সাইরেনের শব্দে কাঁপছে জেরুজালেম
ইরানি হামলার তীব্রতা এতটাই ছিল যে, জেরুজালেমসহ মধ্য-ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবিরাম সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বাজানো হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইরান থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শনাক্ত করার পরপরই বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেরুজালেমের আকাশে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করার দাবি করেছে আইডিএফ। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ সক্রিয় থাকায় অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে হামলার এই ধারাবাহিকতা ইসরায়েলি নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
উত্তর ইসরায়েলে লেবানন থেকেও হামলা
ইরান যখন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, ঠিক তখনই উত্তর ইসরায়েল সীমান্তে সক্রিয় হয়ে উঠেছে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। আইডিএফ-এর তথ্যমতে, ইরান থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল আসার সমান্তরালে লেবানন থেকেও ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট ছোড়া হয়েছে।
উত্তর ইসরায়েলের বেশ কিছু রকেট জনশূন্য এলাকায় পড়েছে বলে দাবি করেছে সামরিক বাহিনী। আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানায়, কিছু রকেট আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে এবং যেগুলো জনবসতিহীন খোলা জায়গায় আঘাত হানার সম্ভাবনা ছিল, সেগুলোকে সামরিক ‘প্রটোকল’ অনুযায়ী পড়তে দেওয়া হয়েছে। এতে করে মূল্যবান ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
যুদ্ধের নতুন সমীকরণ ও আগাম সতর্কতা
রোববার দুপুরে ইরান থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংকেত পাওয়ার পর আবারও উত্তর-ইসরায়েল, শফেলা এবং লোহিত সাগর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে হাই-অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহরগুলোতেও সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এবার তাদের হামলার ধরনে পরিবর্তন এনেছে। তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে হামলা না চালিয়ে বিরতি দিয়ে দফায় দফায় আক্রমণ করছে, যাতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ড্রোনের ভিড়ে ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো লক্ষ্যভেদে সফল হয়।
ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক খতিয়ান
এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আইডিএফ প্রকাশ করেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে জেরুজালেমের আকাশে আগুনের ঝলকানি এবং বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সূত্রমতে, ইসরায়েল এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হলেও ইরানের এই সরাসরি চড়াও হওয়ার ঘটনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ববাসী এখন শঙ্কিত নয়নে তাকিয়ে আছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের শেষ কোথায়।

