ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অন্দরমহলে এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত ঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে নীতিগত সমালোচনা ধেয়ে এলেও, এবার খোদ হিন্দুত্ববাদী শিবিরের অতি পরিচিত মুখ এবং বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুরুতর ব্যক্তিগত অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, একাধিক নারী সংসদ সদস্যকে মন্ত্রী করার পেছনে যোগ্যতার চেয়ে ‘ব্যক্তিগত শারীরিক সম্পর্কের’ বিনিময় কাজ করেছে।
সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর এই বিস্ফোরক মন্তব্যে ঘি ঢেলেছেন এক সময়ের কট্টর মোদি-সমর্থক ও প্রখ্যাত লেখিকা মধু পূর্ণিমা কিশওয়ার। একটি সাম্প্রতিক পডকাস্টে স্বামী আন্তর্জাতিক অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, ভারতের ক্ষমতাশীল মহলের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা নির্দিষ্ট কিছু নারী ও পুরুষ মন্ত্রীর উত্থান কেবল রাজনৈতিক দক্ষতার কারণে হয়নি।
স্মৃতি ইরানি ও জয়শঙ্করকে নিয়ে বিতর্কিত ইঙ্গিত
এই বিতর্কের রেশ ধরে মধু পূর্ণিমা কিশওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর পোস্ট শেয়ার করেছেন। সেখানে তিনি সরাসরি সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির নাম উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, ঠিক কোন জাদুবলে তিনি ২০১৪ সালে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। কিশওয়ার দাবি করেন, হিন্দুত্ববাদী মহলের অন্দরে এই পদায়নগুলো নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানা মুখরোচক ও বিতর্কিত গল্প প্রচলিত ছিল, যা এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
এখানেই শেষ নয়, কিশওয়ারের নিশানায় বাদ পড়েননি বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীও। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে দাবি করেন, এই হেভিওয়েট মন্ত্রীদের নিয়োগের পেছনেও ‘বিশেষ পরিষেবার’ ভূমিকা থাকার কথা শোনা যায়। যদিও ‘বিশেষ পরিষেবা’ বলতে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ভোলবদল না কি ব্যক্তিগত ক্ষোভ?
মধু পূর্ণিমা কিশওয়ারের এই হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন অনেককেই অবাক করেছে। এক সময় মোদিকে ‘আধুনিক ভারতের মহাত্মা গান্ধী’ বলে অভিহিত করা এই লেখিকা কেন নিজের দীর্ঘদিনের আদর্শিক নেতার বিরুদ্ধে এমন কুরুচিপূর্ণ অভিযোগ তুললেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব না পাওয়া বা ব্যক্তিগত কোনো টানাপোড়েন এই আক্রমণের কারণ হতে পারে।
তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিচার করে এখনো পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO) বা ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। সাধারণত এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণকে বিজেপি ‘ভিত্তিহীন’ বলে এড়িয়ে গেলেও, এবার আক্রমণকারী যেহেতু নিজেদের শিবিরের লোক, তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে গেরুয়া শিবির।
প্রমাণ ছাড়াই কি কেবলই কাদা ছোড়াছুড়ি?
এত বড় এবং স্পর্শকাতর অভিযোগ তুললেও সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বা মধু কিশওয়ার—কেউই এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা নথি জনসমক্ষে আনেননি। ফলে আইনি ও নৈতিক দিক থেকে এই অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন রয়ে গেছে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার করার চেষ্টা করলেও, প্রমাণের অভাবে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
২০১৪ সালের একটি বিদেশ সফরের প্রসঙ্গ টেনে কিশওয়ার দাবি করেছেন যে, সেই সময় থেকেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অস্বস্তিকর কথাবার্তা শুনে আসছিলেন। তবে ১২ বছর পর কেন তিনি এই তথ্যগুলো সামনে আনলেন, সেই টাইমিং নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন মোদি-ভক্তরা। বর্তমানে ভারত যখন মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সততা নিয়ে এমন অভিযোগ জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন অস্থিরতার জন্ম দিল।
অপেক্ষায় দিল্লির ক্ষমতার করিডোর
আপাতত দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক পন্ডিতরা মনে করছেন, সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বা কিশওয়ার যদি অদূর ভবিষ্যতে কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে না পারেন, তবে এটি কেবলই একটি রাজনৈতিক কুৎসা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জমা হবে। তবে প্রমাণের চেয়েও বড় কথা হলো, মোদির ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তিতে যে দাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তার প্রভাব ২০২৬-এর আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা পড়বে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

