মধ্যপ্রাচ্যের মরুঝড় ছাপিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণহুংকার। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আয়োজিত এক হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান এখনই থামছে না। তার ভাষায়, “যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি; বরং আসল কাজ এখনো বাকি।” প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ভেতরে এখনো অন্তত ৩ হাজার ৫শ ৫৪টি কৌশলগত ও সামরিক লক্ষ্যবস্তু মার্কিন হামলার তালিকায় রয়েছে, যেগুলোতে আঘাত হানা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তজনাকে এক নতুন এবং বিধ্বংসী মাত্রায় নিয়ে গেল। মিয়ামির ভাষণে তিনি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে, ইরান ও ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তি এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তবে তিনি একই সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন, এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারিত হবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন এখন একটি সুনির্দিষ্ট ‘চেকলিস্ট’ ধরে ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মিশনে নেমেছে।
স্থল অভিযান ছাড়াই জয়ের নীল নকশা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুরেই সুর মিলিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ‘জি-৭’ জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটন তার নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনের একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
রুবিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক উন্মোচন করে বলেন, “ইরানে কোনো ধরনের পদাতিক বা স্থলবাহিনী না পাঠিয়েই কেবল আকাশপথ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেই আমরা কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনব।” তার এই মন্তব্য মূলত গত এক মাস ধরে ইরানের ওপর চালানো বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানের ধারাবাহিকতাকেই ইঙ্গিত করে। মার্কিন প্রশাসন চাইছে নিজেদের সেনার প্রাণহানি এড়িয়ে কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তেহরানকে নতজানু করতে।
সক্রিয় অবকাঠামো ও ট্রাম্পের অগ্রাধিকার
আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩ হাজার ৫শ ৫৪টি লক্ষ্যবস্তু বাকি থাকার অর্থ হলো ইরানের সামরিক, যোগাযোগ এবং বিশেষ করে পারমাণবিক অবকাঠামোর একটি বিশাল অংশ এখনো সচল রয়েছে। ট্রাম্প এই অবশিষ্ট শক্তিকে ধ্বংস করাকেই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। তিনি চাইছেন না ইরানের হাতে এমন কোনো সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকুক, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার তাগিদ দিচ্ছেন, অন্যদিকে হামলার পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দিচ্ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি আসলে তেহরানের ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত চাইছে আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইরানকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এবং দুর্বল করে ফেলতে।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কো রুবিও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, গত কয়েক দিনে ইরানি বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধ এবং কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউস থেকে এটি পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের শান্তি আলোচনার পথ প্রশস্ত হচ্ছে না। ট্রাম্পের এই ‘লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সাড়ে তিন হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর ইরান কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় এক নতুন ধ্বংসস্তূপের নাম হবে তেহরান?


1 Comment
Good post! We will be linking to this particularly great post on our site. Keep up the great writing