মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর দাবি তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আয়োজিত ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ প্রায়োরিটি’ সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হয়তো ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন, অথবা তিনি এমন এক অবস্থায় আছেন যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ ইরানের প্রতিরক্ষা দেয়াল এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তাদের নেতারা এখন মৃত। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা (আয়াতুল্লাহ খামেনি) আর নেই, আর তার ছেলেও হয় মারা গেছেন, নয়তো মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।”
‘নৌ ও বিমানবাহিনী এখন ইতিহাস’
সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প কেবল নেতৃত্বের সংকট নিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনী বলে এখন আর কিছুর অস্তিত্ব নেই; তাদের সব যুদ্ধজাহাজ এখন সমুদ্রের নিচে। একই পরিণতি হয়েছে দেশটির বিমানবাহিনীরও। মার্কিন হামলায় ইরানের যুদ্ধবিমান এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, “আমরা এখন তাদের শেষ সম্বল—অস্ত্রের মজুত ধ্বংস করছি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির কারখানাগুলো এমনভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। এই যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” এই আক্রমণাত্মক সুর স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এবার তেহরানকে কোনোভাবেই নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দিতে নারাজ।
মোজতবা খামেনির রহস্যময় অন্তর্ধান
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হন ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেই একই হামলায় খামেনির পরিবারের অধিকাংশ সদস্য—স্ত্রী, কন্যা ও নাতি-নাতনিরা প্রাণ হারান। মোজতবা খামেনি নিজে সেই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়।
পিতার মৃত্যুর পর শোকাতুর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান মোজতবা খামেনিকেই তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, মোজতবার আঘাত ছিল অত্যন্ত গুরুতর এবং প্রাণঘাতী। যদিও তেহরান পন্থী সূত্রগুলো দাবি করে আসছিল যে, তিনি কেবল পায়ে আঘাত পেয়েছেন এবং বর্তমানে বিপদমুক্ত।
মস্কোর হাসপাতালে কি চলছে লুকোচুরি?
যুদ্ধের ১২তম দিনে অর্থাৎ ১২ মার্চ এক নাটকীয় মোড় নেয় মোজতবা খামেনির গতিবিধি। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ আমন্ত্রণে একটি রুশ সামরিক বিমানে করে তাকে মস্কোতে সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার একটি উচ্চনিরাপত্তা সম্পন্ন হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ট্রাম্পের আজকের মন্তব্য সেই জল্পনাকেই উসকে দিল যে, মস্কোতে মোজতবা খামেনির চিকিৎসা আসলে সফল হচ্ছে কি না। যদি ট্রাম্পের দাবি সত্য হয়, তবে ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। একজন নেতাহীন ইরান এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
কূটনৈতিক সমীকরণ ও অনিশ্চয়তা
ট্রাম্পের এই আগ্রাসী বক্তব্যের পর তেহরান বা মস্কো থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ইরানের সাধারণ মানুষ ও সামরিক বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে।
একদিকে ভারত যেমন মধ্যস্থতাকারী হতে অস্বীকার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে ইরানের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, মস্কোর হাসপাতাল থেকে মোজতবা খামেনির কোনো ভিডিও বার্তা বা বিবৃতি এসে ট্রাম্পের এই দাবিকে নস্যাৎ করতে পারে কি না।

