মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা, তখন দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার আবহে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে ইসলামাবাদ যে তৎপরতা দেখাচ্ছে, তাকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভারত পাকিস্তানের মতো কোনো ‘দালাল’ বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হতে চায় না।
গত বুধবার মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত একটি সর্বদলীয় বৈঠকে জয়শঙ্কর এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে বিরোধী দলগুলো যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের উত্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখনই জয়শঙ্কর তার স্বভাবসুলভ কড়া মেজাজে উত্তর দেন। ভারতের এই অবস্থান মূলত দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সরাসরি প্রভাব বিস্তারের নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পুরানো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি?
বৈঠকে জয়শঙ্কর জোর দিয়ে বলেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সংযোগকারী সেতু হিসেবে পাকিস্তানের এই ভূমিকা মোটেও নতুন কিছু নয়। তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, ১৯৮১ সাল থেকেই পাকিস্তান বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের ‘ব্রোকার’ বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের এই তৎপরতায় অবাক হওয়ার মতো কোনো নতুনত্ব ভারত দেখছে না।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, পাকিস্তান সবসময়ই বৈশ্বিক সংকটের সময় নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে চায়। তবে ভারত তার নিজস্ব কূটনৈতিক পথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। ভারতের এই কঠোর ভঙ্গি মূলত পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতাকে খাটো করে দেখার একটি প্রয়াস হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সংসদীয় উত্তাপ ও সরকারের ব্যাখ্যা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী সেখানে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তবে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারকে চেপে ধরার চেষ্টা করা হয়। তাদের মূল অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান যখন বিশ্বমঞ্চে শান্তি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, তখন ভারত কেন ‘নীরব দর্শক’ হয়ে বসে আছে।
এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারত মোটেও হাত গুটিয়ে বসে নেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। ভারত কোনো আড়ালে থাকা মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যায়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসী ভারতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত লক্ষ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানান, এখন পর্যন্ত ভারতের জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি এবং বিকল্প পথ ও উৎসগুলো সক্রিয় রাখা হয়েছে।
বিরোধীরা অবশ্য সরকারের এই তত্ত্বে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাদের দাবি, পাকিস্তান যেভাবে মিশর ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় জোটের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে জয়শঙ্কর এবং রাজনাথ সিং উভয়েই এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন।
পাকিস্তানের তৎপরতা ও ট্রাম্পের সমর্থন
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অর্থপূর্ণ ও চূড়ান্ত আলোচনা’ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি এমনকি ইসলামাবাদে এই সংলাপ আয়োজনের জন্য নিজের শহর ও কার্যালয় উন্মুক্ত করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছেন বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শাহবাজ শরিফের প্রস্তাবটি শেয়ার করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে একটি গোপন আলোচনার পথ খুঁজছে, যদিও ইরান প্রকাশ্যে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করে আসছে।
কূটনৈতিক দ্বৈরথ ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
কংগ্রেস নেতা তারিক আনোয়ারসহ অন্যান্য বিরোধী নেতারা সরকারের ব্যাখ্যাকে ‘অসন্তোষজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তারা সংসদে এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিতর্কের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভারত যখন নীরব থাকছে, তখন পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিচ্ছে। এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তবে সাউথ ব্লকের কূটনীতিকরা মনে করছেন, ভারতের অবস্থান অনেক বেশি পরিপক্ক। ভারত কোনো সস্তা প্রচারণার অংশ হতে চায় না। ইরানের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব। ভারত সরাসরি উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম, তাই পাকিস্তানের মতো কোনো ‘দালাল’ রাষ্ট্রের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব জাহির করার প্রয়োজন ভারতের নেই।
বর্তমানে ইসরাইল ও ইরান উভয় পক্ষই যুদ্ধের দামামা বাজালেও, মার্কিন প্রশাসনের নমনীয়তা এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতার চেষ্টা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন এবং জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। ভারত এখন দেখার অপেক্ষায় আছে যে, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত কোনো ফল আনে কি না, নাকি এটি কেবলই একটি রাজনৈতিক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকে।
যাই হোক না কেন, জয়শঙ্করের ‘দালাল’ শব্দটির ব্যবহার কূটনৈতিক মহলে দীর্ঘকাল আলোচিত হবে। এটি একদিকে যেমন পাকিস্তানের প্রতি ভারতের চিরাচরিত অবজ্ঞা প্রকাশ করে, অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির এক দৃঢ় বহিঃপ্রকাশও বটে।

