মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। তবে এবার দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কেবল রাজনৈতিক মহলে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তেহরান থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ইরানের এই আধাসামরিক বাহিনীটি এখন থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও সরাসরি সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অনুমতি দিচ্ছে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি এসেছে খোদ আইআরজিসি-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং তরুণ প্রজন্মের “আগ্রহের” কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ইরানে সামরিক বা নিরাপত্তা কাজে অংশগ্রহণের জন্য বয়সের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকলেও, নতুন এই পদক্ষেপে সেই দেয়াল কার্যত ভেঙে ফেলা হলো।
আইআরজিসির সাংস্কৃতিক বিষয়ক কর্মকর্তা রহিম নাদালি তেহরানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘ফর ইরান’ বা ‘ইরানের জন্য’ নামক একটি বিশেষ উদ্যোগের আওতায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত করা।
নাদালি তার বক্তব্যে দাবি করেন, অনেক কম বয়সী কিশোর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের এই আবেগকে সম্মান জানাতেই সর্বনিম্ন বয়স কমিয়ে ১২ বছর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এখন থেকে ১২ ও ১৩ বছর বয়সী শিশুরা তাদের নিজস্ব ইচ্ছায় টহল দল, চেকপোস্ট পাহারা এবং যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নিতে পারবে।
তবে এই “স্বেচ্ছাসেবী” তকমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহতা নিয়ে সরব হয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যুদ্ধ বা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুদের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, যেখানে ইরান নিজেই স্বাক্ষরকারী দেশ, সেখানে শিশুদের সরাসরি কোনো সামরিক তৎপরতায় ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। ১২ বছরের একটি শিশুর পক্ষে যুদ্ধের ভয়াবহতা বা পরিণাম বোঝা অসম্ভব, সেখানে তাদের চেকপোস্টে বা টহলে রাখা জীবনের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার সামিল।
ইতিহাস বলছে, ইরানে শিশুদের সামরিক পোশাকে দেখার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০২২ সালে তরুণী মাহসা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনও রাস্তায় সামরিক পোশাকে শিশুদের টহল দিতে দেখা গিয়েছিল। সেই সময়েই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের এই নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা বা তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য কতটা শোভনীয়, তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠছে।
‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’ নামক সংস্থাটি দাবি করেছে, ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ দমনের নামে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ২০০ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। নতুন এই ঘোষণার পর সেই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যখন রাষ্ট্র নিজেই শিশুদের সামরিক ইউনিফর্মে দেখতে চায়, তখন শিশুদের সুরক্ষার আইনি কাঠামোটি কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে শিশুদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে আসছে। তাদের মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষ কেবল শিশুদের সামরিক কাজে ব্যবহারই করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভ থেকে শিশুদের আটক ও নির্যাতন করার নজিরও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মানদণ্ডে গুরুতর অপরাধ।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্রও বেশ জটিল। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটির বেশি শিশু শ্রমিক রয়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। দারিদ্র্য এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে থাকা এই শিশুদের যখন “দেশপ্রেমের” দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনীতে টেনে আনা হয়, তখন সেটি আর কেবল স্বেচ্ছাসেবী কাজ থাকে না; বরং তা হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় শোষণের এক নতুন হাতিয়ার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইআরজিসি-এর এই পদক্ষেপ ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাকেই ফুটিয়ে তুলছে। অভিজ্ঞ সেনাদের পাশাপাশি শিশুদের মোতায়েন করার অর্থ হলো, ইরান সরকার এখন যেকোনো মূল্যে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মরিয়া। শিশুদের কোমল মনে সামরিক আদর্শ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অনেক ইরানি অভিভাবকও সংগোপনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশু অধিকার কর্মীরা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ১২ বছরের একটি শিশুর থাকার কথা স্কুলে বা খেলার মাঠে, কোনো চেকপোস্টে বন্দুক হাতে নয়। এই বয়সের শিশুদের মানসিক ও শারীরিক গঠন যুদ্ধের কঠোরতা সহ্য করার মতো নয়। যুদ্ধের ময়দানে তাদের উপস্থিতি কেবল তাদের জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলবে না, বরং যুদ্ধাপরাধের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করবে।
ইরানের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। যদি একটি রাষ্ট্র শিশুদের যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে প্রতিবেশী দেশ বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও একই পথ অনুসরণ করার সুযোগ পাবে। এটি সমগ্র অঞ্চলের মানবিক নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত। শিশুদের যুদ্ধে ব্যবহার করার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে আগামী প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের বীভৎসতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
পরিশেষে বলা যায়, ‘ফর ইরান’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইরান হয়তো সাময়িকভাবে কিছু জনবল বাড়াতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশটি এক গভীর মানবাধিকার সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তেহরান যদি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে বিশ্বদরবারে ইরানের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ হবে। শিশুদের রক্তে আর ঘামে অর্জিত নিরাপত্তা কখনো টেকসই হতে পারে না—এই ধ্রুব সত্যটিই এখন ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন বিশ্ববিবেক।

