মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ এখনো মোতায়েন, কিন্তু এর মধ্যেই যুদ্ধের দামামা থামানোর এক ক্ষীণ আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিধ্বংসী সংঘাত নিরসনে এবার সরাসরি শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান। সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শর্ত পেশ করেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে শুরু হওয়া পরোক্ষ আলোচনার অংশ হিসেবেই এই দাবিগুলো উত্থাপন করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর এই প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে এল। তবে ইরানের এই শর্তগুলো এতটাই প্রভাবশালী যে, তা ওয়াশিংটন বা তেল আবিব কতটা মেনে নেবে—তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ইরানের প্রথম এবং প্রধান দাবি হলো ভবিষ্যতে আর কোনোভাবেই যুদ্ধ শুরু হবে না—এমন নিরেট নিশ্চয়তা। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কোনো অস্থায়ী শান্তি চায় না। বরং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেলেই তারা অস্ত্র সংবরণে রাজি। এই নিশ্চয়তা প্রদানের প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা নিয়ে কূটনীতিক মহলে চলছে টানটান উত্তেজনা।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে ইরান একটি নতুন ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ওপর কার্যত ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। বিশ্ববাজারের তেলের বিশাল একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এই দাবি মেনে নেওয়া মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি চাবিকাঠি ইরানের হাতে তুলে দেওয়া।
তৃতীয় শর্তটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। তেহরানের মতে, এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে বিদেশি শক্তির উপস্থিতি। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে দেশটি।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে বিতর্কিত শর্তটি হলো গণমাধ্যম সংক্রান্ত। ইরান দাবি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো বা অপপ্রচারে লিপ্ত সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইরানের হাতে তুলে দেওয়া অথবা তাদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে এই দাবিটি পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার এক বক্তব্যে জানান, ওয়াশিংটন বেশ কিছুদিন ধরেই ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “এবার মনে হচ্ছে ইরান বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।” গত কয়েক মাসের অস্থিরতার পর ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, যদিও পর্দার পেছনের সমীকরণ এখনো অত্যন্ত জটিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই পাঁচ শর্তের মধ্যে যেমন নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন ঘাঁটি সরানোর মতো দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য হজম করা কঠিন হতে পারে। তবে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রিতা ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো মধ্যস্থতায় পৌঁছাতে পারে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের এই শর্তগুলো শান্তি আলোচনার ভিত্তি হবে নাকি সংঘাতকে আরও উসকে দেবে—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। মিডল ইস্ট মনিটর ও মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো উঠে এসেছে।

