মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সংঘাতের মাত্রা এখন চরমে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সরাসরি যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পার হতে না হতেই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। রোববার সন্ধ্যায় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আইডিএফ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে চার শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই ইসরায়েলের ওপর চালানো সবচেয়ে বড় এবং ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইরান এখন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে আঘাত হানার চেষ্টা করেছে। তবে ইসরায়েলের বহুল আলোচিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- অ্যারো-৩ এবং ডেভিডস স্লিং) এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৯২ শতাংশই মাঝ আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। শোশানি এই সাফল্যকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শনিবার দক্ষিণ ইসরায়েলের দুটি প্রধান শহরে ইরানের কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রায় ১৮০ জন ইসরায়েলি নাগরিককে জরুরি চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে যখন মিসাইলগুলো জনবহুল এলাকায় আছড়ে পড়ে, তখন সেখানে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিকট শব্দে কেঁপে ওঠা শহরগুলোতে এখনো ধোঁয়া আর ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন বিদ্যমান।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এখন বিশ্ব নেতাদের সক্রিয় সমর্থনের ওপর জোর দিচ্ছেন। রোববার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সরাসরি আহ্বান জানান, এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। নেতানিয়াহু বলেন, “ইরান আজ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নষ্ট করছে না, বরং তাদের দূরপাল্লার মিসাইল সক্ষমতা ইউরোপসহ সারা বিশ্বের জন্য হুমকি।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ‘অশুভ শক্তির’ বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ব্যাপকতা নির্দেশ করছে যে তেহরান তার পুরো সমরাস্ত্র ভাণ্ডার এই যুদ্ধে নিয়োজিত করেছে। এর পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতিমধ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে ৪০০ মিসাইলের এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের তীব্রতাকে এক ভয়াবহ রূপ দিয়েছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। একদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি, অন্যদিকে ক্রমাগত মিসাইল বৃষ্টি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজার এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৯২ শতাংশ মিসাইল ঠেকানোর দাবি করলেও, বাকি ৮ শতাংশের প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা দক্ষিণ ইসরায়েলের শহরগুলোর ধ্বংসযজ্ঞই বলে দিচ্ছে।

