মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তপ্ত সংঘাতের দশম দিনে বাহরাইনের সিত্রা দ্বীপে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার নেপথ্য কারণ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। গত ৯ মার্চ ভোরে রাজধানী মানামার উপকণ্ঠে মাহাজ্জা এলাকায় ডজনখানেক বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার সেই ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে ইরানকে দায়ী করা হলেও, নতুন গবেষণায় আঙুল উঠছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই দিন সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংসকারী বস্তুটি কোনো ইরানি ড্রোন ছিল না, বরং সেটি ছিল মার্কিন বাহিনীর পরিচালিত ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছোড়া একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল।
ঘটনার দিন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছিল, একটি ইরানি ড্রোন বাহরাইনের আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে। বাহরাইন সরকারও শুরুতে একই সুরে সুর মিলিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ দুই সপ্তাহ পর গত শনিবার (২১ মার্চ) মানামা প্রশাসন প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যে, মাহাজ্জার ওই ধ্বংসলীলায় একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল জড়িত ছিল। তবে তাদের দাবি, মিসাইলটি আকাশেই একটি ইরানি ড্রোনকে রুখে দিয়েছিল এবং সেই ধ্বংসাবশেষের আঘাতেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যদিও বাহরাইন বা ওয়াশিংটন—কেউই এখন পর্যন্ত মাহাজ্জার সেই আবাসিক এলাকায় ইরানি ড্রোনের উপস্থিতির কোনো অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, প্যাট্রিয়টের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী ইন্টারসেপ্টর মিসাইল যখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় বা নিচু উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়, তখন তা নিজেই একটি বড় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিস্ফোরণ পরবর্তী মাহাজ্জার রাস্তাগুলো ধুলোর স্তরে ঢেকে গেছে এবং বাসিন্দাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ। ৩২ জন আহতের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
এই যুদ্ধ কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সস্তা ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহারের ঝুঁকি এখন মিত্র দেশগুলোর ওপরই পড়ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে রাতে মাহাজ্জায় এই বিস্ফোরণ ঘটে, সেই একই রাতে সিত্রা দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারটি ইরানি হামলা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ফলে কয়েক ঘণ্টা পরেই শোধনাগারটি তাদের কার্যক্রম বন্ধ বা ‘ফোর্স মেজিউর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তারা ইরানের ড্রোন তৈরির ক্ষমতা ‘গুঁড়িয়ে দিচ্ছে’। বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি অস্বীকার করলেও প্যাট্রিয়ট মিসাইলের ভুল লক্ষ্যভেদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলো তিনি এড়িয়ে গেছেন।
উল্লেখ্য যে, এটিই প্রথম নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলার ঘটনায় তদন্তকারীরা জানিয়েছিলেন, পুরনো ‘টার্গেটিং ডেটা’ বা ভুল তথ্যের কারণে সম্ভবত মার্কিন বাহিনীই এর জন্য দায়ী ছিল। বাহরাইনের ঘটনাটি সেই একই ধরনের যান্ত্রিক বা কৌশলগত ত্রুটির পুনরাবৃত্তি কিনা, তা নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন দানা বাঁধছে।
পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি বাহরাইন এখন এক উভয়সংকটে। একদিকে ইরানের সম্ভাব্য ড্রোন হামলা, অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘টেকনিক্যাল কোলাটেরাল ড্যামেজ’—সব মিলিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। মাহাজ্জার ধ্বংসাবশেষের স্তূপ এখন কেবল যুদ্ধের ক্ষত নয়, বরং আধুনিক সমরাস্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও এক বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

