মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ আরও এক ধাপ চড়েছে। এবার লেবানন সীমান্ত থেকে ছোড়া শক্তিশালী ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইলের আঘাতে উত্তর ইসরায়েলে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আজ রোববার দুপুরে সীমান্তবর্তী শহর মিসগাভ আম লক্ষ্য করে এই হামলা চালায় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতের আবহে হিজবুল্লাহর এই নতুন তৎপরতা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতময় করে তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে, হামলাটি এতটাই অতর্কিত ছিল যে আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পাননি ওই ভুক্তভোগী। হিজবুল্লাহর ছোড়া মিসাইলটি সরাসরি আঘাত হানে সড়কে চলমান দুটি যানে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি দুটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা ও ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। ঘটনার আকস্মিকতায় সীমান্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইসরায়েলের জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা সংস্থা ‘মেগান ডেভিড অ্যাডম’ (এমডিএ) এই হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির প্যারামেডিকরা জানিয়েছেন, হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান তারা। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা একটি গাড়ির ভেতর থেকে এক ব্যক্তিকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তবে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য গাড়িটিতে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থা বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানিয়েছে, লেবানন সীমান্ত থেকে অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল ছোড়ার ঘটনাটি তাদের রাডারে ধরা পড়েছে। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, মিসগাভ আম এলাকার নিরাপত্তা চৌকি বা সামরিক টহলের ওপর নজরদারি করেই এই নিখুঁত নিশানায় হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের শীর্ষ নেতা আয়তুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো এখন অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করে বলা হয়েছে, সীমান্তে ইসরায়েলের ক্রমাগত উসকানির জবাব দিতেই তারা এই ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই ঘটনাটি উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আতঙ্ক জাগিয়ে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে এক ধরনের অস্থির শান্তি বজায় থাকলেও এখন তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম। নিয়মিত ড্রোন এবং মিসাইল বিনিময় এখন প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি সরকার ইতিমধ্যে উত্তরের সীমান্ত এলাকার নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ড্রোন টহল বৃদ্ধি পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এই প্রাণহানির ঘটনা ইসরায়েলি প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যখন দেশটি ইতিমধ্যে ইরানের ব্যাপক মিসাইল হামলার ধকল সামলাতে ব্যস্ত। এমন অবস্থায় হিজবুল্লাহর সাথে উত্তর সীমান্তে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। তেল আবিব এই হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে লেবাননের ভেতরে হিজবুল্লাহর কোনো শক্তিশালী অবস্থানে আঘাত হানবে কিনা, তা নিয়ে এখন চলছে জোর জল্পনা।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যেন মিসাইল আর পাল্টাপাল্টি হুমকির চাদরে ঢাকা। মিসগাভ আমের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, শান্তির পথ এখন আরও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। কূটনীতির টেবিলে সমাধান খোঁজার চেয়ে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলাটাই এখন এই অঞ্চলের রণকৌশলে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায় পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখলেও সীমান্ত সংঘাত থামানোর কার্যকর কোনো পথ এখনো দৃশ্যমান নয়।

