মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক সপ্তাহে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তা সাম্প্রতিক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর থেকেই তেহরান এক ভয়াবহ প্রতিশোধের পথ বেছে নেয়। তবে এই পাল্টা লড়াইয়ের সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ইরানের ছোড়া মিসাইল ও ড্রোনের সিংহভাগই ইসরায়েলের সীমানায় না পড়ে আঘাত হেনেছে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে।
আল-আরাবিয়ার সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সমরচিত্রের নেপথ্য পরিসংখ্যান। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ইরান তার সামরিক শক্তির মূল প্রয়োগ ঘটিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর। এটি স্পষ্ট যে, তেহরানের রণকৌশল শুধুমাত্র সরাসরি শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, বরং শত্রু যেখানে আশ্রয় নিয়েছে বা যেখান থেকে হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে, সেই ভূখণ্ডগুলোর দিকেও সমানভাবে তাক করা।
পরিসংখ্যানের ভাষায় বলতে গেলে, ইরান এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৪ হাজার ৯১১টি মিসাইল ও ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে। সাধারণ জনমনে ধারণা ছিল, তেহরানের মূল ক্ষোভ হয়তো সরাসরি তেল আবিবের ওপর ঝরবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এই বিশাল সমরাস্ত্র ভাণ্ডারের মধ্যে মাত্র ৮৫০টি ড্রোন ও মিসাইল ইসরায়েলের দিকে ছুড়েছে ইরান। বাকি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আঘাত হেনেছে আরব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানে।
তদন্তকারী সাংবাদিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই লড়াইয়ে এক ধরনের ‘প্রক্সি-সেন্ট্রিক’ বা ছায়াযুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী, আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ১ হাজার ১১৯টি মিসাইল এবং ৩ হাজার ৭৯২টি ড্রোন ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, ইরানের মোট সামরিক অভিযানের প্রায় ৮৫ শতাংশই পরিচালিত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিপরীতে, ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হেনেছে মাত্র ৩০০টি মিসাইল এবং ৫৫০টি ড্রোন। এটি মোট হামলার মাত্র ১৫ শতাংশ। এই বৈষম্যপূর্ণ আক্রমণ পদ্ধতি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে আন্তর্জাতিক মহলে। কেন ইরান তার মূল শত্রুকে ছেড়ে প্রতিবেশীদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে এত বড় মাত্রায় টার্গেট করল? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পিছু হটতে বাধ্য করার এটিই তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় ধরনের শূন্যতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। সেই ক্ষোভের অনল এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে। আরব দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছিল, তারা এখন আক্ষরিক অর্থেই দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে গেছে। একদিকে মার্কিন মিত্রতা রক্ষা, অন্যদিকে ইরানের এই ব্যাপক ড্রোন হামলার মুখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা—উভয়ই এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। রাত হলেই আকাশ চিরে ড্রোনের গুঞ্জন আর মিসাইলের গর্জনে প্রকম্পিত হচ্ছে রিয়াদ থেকে কুয়েত, কাতার থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকগুলো ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করার দাবি করেছে, তবুও এত বিপুল সংখ্যক অস্ত্রের মোকাবিলা করা যে কোনো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই দুঃসাধ্য।
ইরানের এই সমর কৌশলের নেপথ্যে সম্ভবত একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও কাজ করছে। তারা বোঝাতে চাইছে যে, আরব দেশগুলো যদি মার্কিন বাহিনীকে তাদের মাটি ব্যবহার করতে দেয়, তবে সেই মাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তেহরান নেবে না। এই ‘জিরো-সাম গেম’ বা অস্তিত্বের লড়াইয়ে আরব দেশগুলোর অবকাঠামো এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে ওই অঞ্চলের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলের আশঙ্কা, যদি এই হামলা আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়বে।
যুদ্ধক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবিক বিপর্যয়। ড্রোন ও মিসাইল হামলাগুলো যতটা না সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে, তার চেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জনমনে। যদিও তেহরান দাবি করেছে তাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্টভাবে মার্কিন ঘাঁটি, কিন্তু গত কয়েক দিনের চিত্র বলছে, এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির অবসান কোথায়, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। ওয়াশিংটন থেকে জোরালো পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এদিকে তেহরান তার অবস্থানে অনড়। তাদের ভাষায়, খামেনির রক্তের ঋণ তারা শোধ করবেই, আর এর জন্য দায়ী প্রতিটি পক্ষকে চড়া মূল্য দিতে হবে।
আরব দেশগুলোর সরকারগুলো এখন এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ। তারা একদিকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের দায়ভার নিতে চাচ্ছে না, অন্যদিকে ইরানের এই আগ্রাসনও মেনে নিতে পারছে না। আঞ্চলিক জোটগুলোর জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে, তবে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তাপ এখন আলোচনার টেবিলের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর।
ইরানের এই নজিরবিহীন মিসাইল বৃষ্টির পর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ড্রোন ও মিসাইলের এই শতাংশের হিসাব কেবল সংখ্যা নয়, এটি আগামী দিনের এক নতুন এবং ভয়াবহ রাজনৈতিক সমীকরণের সংকেত। পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিকুণ্ডের দিকে, যেখানে শান্তি এখন এক সুদূরপরাহত কল্পনা বলে মনে হচ্ছে।

