মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, তখন তেহরানের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেন ক্রেমলিন শাসক ভ্লাদিমির পুতিন। পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’ উপলক্ষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে পাঠানো এক বিশেষ বার্তায় পুতিন আশ্বস্ত করেছেন যে, এই কঠিন সময়ে রাশিয়া ইরানের পাশেই আছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে শনিবার (২১ মার্চ) এই তথ্য জানানো হয়েছে।
পুতিন তাঁর বার্তায় অত্যন্ত সোজাসুজি ভাষায় বলেন, “বর্তমান এই চ্যালেঞ্জিং ও কঠিন সময়ে মস্কো তেহরানের জন্য একজন বিশ্বস্ত বন্ধু এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেই থাকবে।” রাশিয়ার এই প্রকাশ্য সমর্থন এমন এক সময়ে এল যখন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত পুরো অঞ্চলকে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। মস্কোর এই অবস্থানকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তবে পুতিনের এই উষ্ণ বাণীর আড়ালে রাশিয়ার প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে তেহরানের অন্দরেই কানাঘুষা শুরু হয়েছে। কিছু ইরানি সূত্রের দাবি, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান বর্তমানে সম্ভবত সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই তুলনায় মস্কোর কাছ থেকে যে ধরনের সামরিক বা গোয়েন্দা সহায়তা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বার্তায় বন্ধুত্ব থাকলেও ময়দানে রাশিয়ার সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।”
এরই মধ্যে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’ এক চাঞ্চল্যকর দাবি তুলেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো সম্প্রতি ওয়াশিংটনকে একটি গোপন প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানকে তথ্য দেওয়া বন্ধ রাখবে। যদিও ক্রেমলিন এই রিপোর্টকে ‘ভিত্তিহীন ও ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ধরনের খবরের ডালপালা ছড়ানো স্বাভাবিক।
রাশিয়া মনে করে, ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে এক গভীর গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার ফলে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। মজার ব্যাপার হলো, এই উচ্চমূল্যের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। ফলে রণক্ষেত্রে সরাসরি না জড়ালেও এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির অংকে মস্কো যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে রাশিয়ার এই সমর্থনের একটি স্পষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মস্কো তেহরানের কৌশলগত অংশীদার হলেও তারা চায় না ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হোক। রাশিয়ার আশঙ্কা, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়ঙ্কর পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে, যা রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলতে পারে। ফলে নাতানজ বা ফোর্দোর মতো পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার বিষয়ে পুতিনের প্রতিক্রিয়া বরাবরই বেশ সতর্ক।
সব মিলিয়ে পুতিনের এই নওরোজ বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার প্রভাব বজায় রাখার একটি সুনিপুণ চাল। একদিকে তেহরানকে ভরসা দেওয়া, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সাথে পর্দার আড়ালে দর কষাকষি—পুতিন এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবার বোর্ডে অত্যন্ত সাবধানী খেলোয়াড়। কঠিন সময়ে ইরানের পাশে থাকার এই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তব রূপ পায়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

