মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলায় প্রকম্পিত, ঠিক সেই মুহূর্তে যুদ্ধের ডামাডোল আরও বাড়িয়ে দিলেন ইসরায়েলের নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। শনিবার (২১ মার্চ) শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক শেষে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর চলমান হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কাৎজের এই হুঁশিয়ারি সংঘাতের মাত্রা এক নতুন এবং আরও বিধ্বংসী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাপ্তাহিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন সভায় কাৎজ অত্যন্ত কঠোর সুরে বলেন, “ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বর্তমানে যৌথভাবে ইরান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক অবস্থানের ওপর যে অভিযান চালাচ্ছে, আগামী কয়েক দিনে তার ব্যাপ্তি ও আঘাতের ক্ষমতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বৃদ্ধি পাবে।” তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই অঞ্চলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পুরোপুরি সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা হামলার খবরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কাৎজ বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী শক্তিশালী এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম। যুদ্ধের প্রতিটি লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের হাত থামবে না।” তাঁর এই বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ছায়াযুদ্ধ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ও উন্মুক্ত লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কাৎজের ‘হামলার তীব্রতা বাড়ানোর’ এই হুমকি মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এবং তেল ও গ্যাস অবকাঠামোকে পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়ার একটি পরিকল্পনার অংশ। ইতিমধ্যে ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ড এবং বিভিন্ন নৌ-ঘাঁটিতে হামলার ফলে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ইসরায়েল এখন চাইছে সেই ক্ষতকে আরও গভীর করতে, যাতে তেহরান আর পাল্টা আঘাত হানার সামর্থ্য না রাখে।
এদিকে, শনিবার সকালেই সেন্ট্রাল ইসরায়েলের রিশন লেজিয়ন এলাকায় একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ এসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে ইসরায়েল একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। কাৎজের ভাষ্যমতে, ইরানের ‘সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠী’ যতদিন পর্যন্ত আঞ্চলিক অস্থিরতা বজায় রাখবে, ততদিন আইডিএফ তাদের প্রতিটি কৌশলগত সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ (Epic Fury) এবং ‘রোয়ারিং লায়ন’ (Roaring Lion) নামে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে কয়েক হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা ওই অঞ্চলে পাঠিয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তারা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে বদ্ধপরিকর।
এখন বিশ্ববাসীর নজর তেহরানের দিকে। নাতানজে হামলার পর এবং কাৎজের এই নতুন হুমকির জবাবে ইরান কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের বিশ্ব পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি। মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই এক বড় ধরনের আঞ্চলিক মহাপ্রলয়ের সংকেত দিচ্ছে।

