মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আজ এক চূড়ান্ত ও ভয়াবহ মোড় নিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত ‘নাতানজ’ পারমাণবিক স্থাপনায় শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার (২১ ২১ মার্চ) এই বিধ্বংসী অভিযান চালানো হয়। মাটির গভীরে থাকা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল এই হামলার মূল লক্ষ্য।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘কান’ অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, নাতানজের ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো ধ্বংস করতে বিশেষভাবে তৈরি এই বাঙ্কার বাস্টার বোমাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং মাটির কয়েক স্তর নিচে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। ফলে পাহাড়ের ভেতরে বা মাটির গভীরে থাকা সুরক্ষিত ল্যাবরেটরিগুলোও এই হামলার হাত থেকে রেহাই পায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, শনিবার ভোর থেকেই নাতানজ এলাকায় বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নাতানজ হলো ইরানের সেই কৌশলগত কেন্দ্র যেখানে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত ও প্রক্রিয়াজাত করা হতো, যা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই পশ্চিমাদের সাথে তেহরানের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল।
বিগত বছরগুলোতেও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যে খণ্ডযুদ্ধ চলেছিল, সেই সময়ও ফোর্দো ও নাতানজের ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র এক ডজনেরও বেশি বিশালাকৃতির বোমা সরবরাহ করেছিল। তবে শনিবারের এই ‘বাঙ্কার বাস্টার’ হামলাটি আগের সবগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং ধ্বংসাত্মক বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
এই হামলার ফলে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তেহরান এই হামলার পর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইরান আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিল যে, তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় কোনো ধরনের আঘাত এলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। নাতানজের এই ধ্বংসলীলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে এক অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট অভিযান নিয়ে বিস্তারিত কিছু না জানানো হলেও, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বারবারই বলে আসছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রুখতে তারা যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। শনিবারের এই হামলা সেই অনমনীয় অবস্থানেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
নাতানজের এই ধ্বংসযজ্ঞের পর তেহরান এখন পাল্টা কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব। এই হামলা কি ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে, নাকি এটি এক অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা করবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর মাটির গভীরে থাকা নাতানজের সেই ল্যাবরেটরিগুলো এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ।

