মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে কি তবে যুদ্ধের কালো মেঘ সরতে শুরু করেছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় অন্তত এমনটাই আভাস মিলছে। গত কয়েক সপ্তাহের তীব্র উত্তেজনার পর শুক্রবার (২০ মার্চ) ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ কথা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট কাটাতে ইরানি তেল চালানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তাই মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের যে বিশাল সামরিক প্রচেষ্টা চলছে, তা গুটিয়ে নেওয়ার কথা আমরা ভাবছি।” গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই বার্তাকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, প্রেসিডেন্ট এবং পেন্টাগন আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন যে এই মিশন সম্পন্ন করতে আনুমানিক ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগবে। সেই সময়সীমার মধ্যেই অভিযানের একটি সফল সমাপ্তি টানতে চাইছে বাইডেন-পরবর্তী ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের পক্ষ থেকে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকায় এবং সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, ২০ মার্চের আগে জাহাজে বোঝাই করা ইরানি অপরিশোধিত তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রয় ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফেরাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন ট্রাম্প। শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ইরানের সরকার পতন আর যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নয়।” অথচ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে এই আগ্রাসন শুরু করেছিল, তখন মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটন করা। ট্রাম্পের এই সুর পরিবর্তনকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পিছুটান হিসেবে দেখছেন অনেকে।
অবশ্য রণক্ষেত্রে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শত্রুদের ওপর ‘চরম আঘাত’ হানার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর ইরান থেকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এর পাল্টা জবাবে শনিবার (২১ মার্চ) ভোরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তেহরানের ‘শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুগুলোতে’ বিমান হামলা চালিয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে ট্রাম্পের শান্তিপ্রক্রিয়ার ইঙ্গিত আর অন্যদিকে ইসরায়েল-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। ট্রাম্প কি আসলেই যুদ্ধ শেষ করতে চাইছেন, নাকি এটি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি সাময়িক কৌশল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে আপাতত ‘নিষেধাজ্ঞা শিথিল’ করার বিষয়টি বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে ট্রাম্পের এই ‘পিছু হটার’ ঘোষণা কতটুকু কার্যকর হয়, তা নির্ভর করছে তেহরান ও তেল আবিবের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। যদি ১৯ এপ্রিলের মধ্যে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি সম্ভব না হয়, তবে এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

