মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের ধোঁয়া ক্রমেই ঘন হচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিস্ফোরক মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের মাঝেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ‘প্রচুর সহায়তার’ আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তাঁর নেই।
শনিবার (২১ মার্চ) হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বর্তমান পরিস্থিতির এক রূঢ় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল জলপথ নিরাপদ রাখা এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে চীন ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোর আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসা উচিত। ট্রাম্পের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সক্ষম এবং ইউরোপ বা এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় এই জলপথের ওপর ওয়াশিংটনের নির্ভরতা অনেক কম।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারিও লুকিয়ে ছিল। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, যদি বিশ্ববাজার জ্বালানি সংকটে পড়ে, তবে তার দায়ভার সেই সব দেশকেই নিতে হবে যারা এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে সহায়তা করতে এগিয়ে আসছে না। বিশেষ করে চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের নিষ্ক্রিয়তায় ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তবে আলোচনার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি তা সরাসরি নাকচ করে দেন। অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে ট্রাম্প বলেন, “যখন প্রতিপক্ষকে পূর্ণমাত্রায় ধ্বংস করা হচ্ছে, তখন মাঝপথে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” তাঁর এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এখন ইরানকে সামরিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘অল-আউট’ যুদ্ধের মানসিকতা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে এক চূড়ান্ত ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার সংঘাত কমানোর বা ‘ডি-এস্কেলেশন’-এর কথা বলছে, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই রণহুঙ্কার যুদ্ধের আয়ু আরও দীর্ঘতর করবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখন এক গোলকধাঁধায় রূপ নিতে পারে।
ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের পর বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে তাদের নতি স্বীকারে বাধ্য করাই হলো এই যুদ্ধের একমাত্র সমাধান। আর এই পথে তিনি কোনো ধরনের ‘বিরতি’ বা ‘শীতলতা’র সুযোগ দিতে রাজি নন।
হোয়াইট হাউসের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। একদিকে মিত্রদের অংশগ্রহণ বাড়ানো আর অন্যদিকে তেহরানকে একঘরে করে ফেলা—এই দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে পেন্টাগন। তবে ট্রাম্পের এই সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান মিত্র দেশগুলোর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তারা সরাসরি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
শনিবারের এই সংবাদ সম্মেলনের পর ইরান বা ন্যাটোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, এটি পরিষ্কার যে বৈশ্বিক কূটনীতি এখন এক ভয়াবহ অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি এখন ‘ফিনিশ লাইনের’ লড়াই। আর এই লড়াইয়ে তিনি কোনো সহমর্মিতা বা সমঝোতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত নন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আজ ঈদের খুশির চেয়েও ট্রাম্পের এই যুদ্ধের হুঙ্কার বেশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

