পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন কেবল যুদ্ধের রণক্ষেত্র নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ইরান ও পশ্চিমা শক্তির এই সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষত সারিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই আশঙ্কার কথা জানান।
ফাতিহ বিরল বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ইতিহাসের বৃহত্তম বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিশ্ববাজারের নীতিনির্ধারকরা এই সংকটের গভীরতাকে এখনো চরমভাবে অবমূল্যায়ন করছেন। ১৯৭০-এর দশকের প্রখ্যাত তেল সংকট কিংবা ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট অস্থিরতাকেও হার মানিয়েছে বর্তমানের এই অচলাবস্থা।
পরিসংখ্যান দিয়ে বিরল দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে যে পরিমাণ তেলের সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, তা সত্তরের দশকের সংকটের চেয়েও অনেক বেশি। এমনকি ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে ইউরোপে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়েছিল, বর্তমান সংঘাতের কারণে তার দ্বিগুণ পরিমাণ গ্যাস বিশ্ববাজারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই খনিজ ভাণ্ডারকে তিনি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ‘প্রধান ধমনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বর্তমানে কার্যত অচল।
গত এক সপ্তাহে ইরানের বিশাল ‘সাউথ পার্স’ গ্যাসক্ষেত্র এবং কাতারের ‘রাস লাফান’ কমপ্লেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফাতিহ বিরল স্পষ্ট করে বলেছেন, যতক্ষণ না ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন হচ্ছে, ততক্ষণ তেলের এই দাম বাড়তেই থাকবে।
সংকটের প্রভাব কেবল তেলের ট্যাংকারে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সরবরাহের শিকল ছিঁড়ে যাওয়ায় সার উৎপাদন, প্লাস্টিক তৈরির পেট্রোকেমিক্যালস, পোশাক শিল্প এবং এমনকি হিলিয়াম ও সালফারের মতো অতি প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের বৈশ্বিক বাজারও ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বজুড়ে উৎপাদনমুখী শিল্পগুলো এখন কাঁচামালের তীব্র সংকটে ভুগছে।
ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিতে গিয়ে আইইএ প্রধান বলেন, “যুদ্ধ যদি আজই শেষ হয়ে যায়, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সচল করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। কিছু স্থাপনা হয়তো ছয় মাসে ফিরবে, কিন্তু বড় রিফাইনারি বা গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ক্ষেত্রে এই সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।” সংকট সামাল দিতে আইইএ তাদের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বিরল মনে করেন, এটি সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জল মাত্র। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল না হওয়া পর্যন্ত কেবল মজুত দিয়ে এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়।
ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি একটি বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। রাশিয়ার ওপর থেকে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পুরোনো ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। মস্কোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের আবারও বিপদে ফেলতে পারে।” বরং এই সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং বৈদ্যুতিক যানের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ফাতিহ বিরল ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এই ভয়াবহ সংকট বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে। সাময়িকভাবে কয়লার ব্যবহার বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করবে এই যুদ্ধ। তবে আপাতত সাধারণ মানুষের পকেটে যে টান পড়ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি যে মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা থেকে পরিত্রাণের কোনো সহজ পথ এই মুহূর্তে নেই।
পারস্য উপসাগরের আগুনের আঁচ এখন লন্ডন থেকে টোকিও—প্রতিটি শহরের রান্নাঘর আর কলকারখানায় পৌঁছে গেছে। যুদ্ধের ময়দানে কে জিতবে তা অজানা থাকলেও, জ্বালানি সংকটের এই যুদ্ধে পুরো বিশ্ব যে ইতিমধ্যে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে, ফাতিহ বিরলের বক্তব্যে সেই রূঢ় সত্যই ফুটে উঠেছে।

