চীনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত পড়ার টেবিল আর পরীক্ষার ফলের বাইরে অন্য কিছু ভাবার অবকাশ থাকে না বললেই চলে। কঠোর পরিশ্রম আর প্রতিযোগিতার সেই চিরচেনা সংস্কৃতির দেয়ালে এবার কিছুটা ফাটল ধরাতে চাইছে খোদ কর্তৃপক্ষই। শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে বইয়ের চাপ কমিয়ে তাদের মন দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে দেশটির একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এই ‘প্রেমের আহ্বান’ কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর রাষ্ট্রীয় ও জনতাত্ত্বিক সংকট।
সিচুয়ান প্রদেশের ‘সাউথওয়েস্ট ভোকেশনাল কলেজ অব এভিয়েশন’ তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আসন্ন বসন্তকালীন ছুটির এক অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘ফুল দেখো ও প্রেমে পড়ো’। শুনতে রোমান্টিক মনে হলেও, এর আসল লক্ষ্য হলো তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক বন্ধন ও সম্পর্কের দিকে ধাবিত করা। দেশটির সরকার যখন নিম্নমুখী জন্মহার আর কমতে থাকা বিয়ের হার নিয়ে দিশেহারা, ঠিক তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে চীনে টানা চতুর্থ বছরের মতো জনসংখ্যা কমেছে। এটি কেবল কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। কর্মক্ষম মানুষের অভাব আর বয়স্কদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চীন এখন এক জনতাত্ত্বিক চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি) এখন ‘শিশু-বান্ধব’ শহর গড়ার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ এবং বিখ্যাত ট্রিপ ডটকম-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জেমস লিয়াং এই সংকটের গভীরে আলোকপাত করেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল উপদেশ দিয়ে জন্মহার বাড়ানো সম্ভব নয়। লিয়াং বলেন, ‘সন্তান পালনের জন্য একটি সুস্থ সমাজের পর্যাপ্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজন আছে। একই সঙ্গে বড় পরিবারের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুবিধাগুলো সম্পর্কে তরুণদের শিক্ষিত করা এখন সময়ের দাবি।’ মূলত এই আদর্শিক পরিবর্তনের লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং সম্পর্কের বলয়ে নিয়ে আসতে চাইছে সিচুয়ান সাউথওয়েস্ট ভোকেশনাল কলেজ।
চীনের অনেক তরুণ এখন বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজার তাদের পারিবারিক জীবনের প্রতি বিমুখ করে তুলেছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে সরকার এখন প্রথাগত গ্রীষ্ম ও শীতকালীন ছুটির পাশাপাশি নতুন করে ‘বসন্তকালীন ছুটি’ চালুর পরিকল্পনা করছে। এই ছুটির মূল উদ্দেশ্যই হলো তরুণদের ভ্রমণে উৎসাহিত করা, অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা বাড়ানো এবং সর্বোপরি নতুন সম্পর্কের সূচনা করা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই ‘প্রেমে পড়ার’ আহ্বান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছে। অনেকেই একে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন—কেবল ছুটি দিয়ে বা উৎসাহিত করে কি দীর্ঘদিনের এই জটিল সংকট সমাধান সম্ভব? তবুও চীন হাল ছাড়তে নারাজ। তারা চাইছে তরুণরা যেন কেবল যান্ত্রিক জীবনের অংশ না হয়ে মানবিক সম্পর্কের দিকেও নজর দেয়।
চীনের এই সংকট এবং তার অদ্ভুত সব সমাধান বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন প্রযুক্তি আর আধুনিকতায় চীন বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে তখন ‘প্রেম’ আর ‘পরিবার’ টিকিয়ে রাখতে তাদের রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সিচুয়ানের এই কলেজের শিক্ষার্থীরা আসন্ন বসন্তের ছুটিতে সত্যিই প্রেমে পড়বে কি না, তা সময় বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ড্রাগনের দেশে এখন জনমিতির ভারসাম্য রক্ষাই সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

