মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন পশ্চিমা শক্তির অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই লন্ডনকে সরাসরি যুদ্ধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাল তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক কড়া বার্তায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যদি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তাকে ‘সরাসরি আগ্রাসন’ হিসেবে গণ্য করবে ইরান।
নিজের অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আরাগচি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের এই ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। আরাগচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নিজের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় ইরান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার’ প্রয়োগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, যখন আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে এই যুদ্ধ শুরু করেছে। তিনি ব্রিটেনসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অভিহিত করেন। আরাগচির মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় নীরব থেকে প্রকারান্তরে হামলাকারীদের উৎসাহিত করছে।
এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের প্রেক্ষাপটে আরাগচি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বোমা হামলার প্রসঙ্গটি নতুন করে সামনে আনেন। ওই মর্মান্তিক ঘটনায় ১৬৫ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, যাদের সিংহভাগই ছিল নিষ্পাপ শিশু। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই হামলার দায় ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিলেন।
তবে সত্য বেশিদিন চাপা থাকেনি। পেন্টাগনের চলমান অভ্যন্তরীণ তদন্তের বরাত দিয়ে আরাগচি দাবি করেন, ওই হামলাটি আসলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছোঁড়া একটি ‘টমাহক’ মিসাইলের আঘাতেই ঘটেছিল। এই তথ্য সামনে আসার পর ওয়াশিংটনের নৈতিক অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। আরাগচি মনে করেন, এই ধরনের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ আড়াল করতেই এখন নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরাগচির এই কড়া বার্তার পর এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ডাউনিং স্ট্রিট ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি এখন এক নতুন কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। যদি ব্রিটেন সত্যিই তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কেবল আরব অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ইউরোপের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরান বারবার বলছে যে তারা যুদ্ধের বিস্তার চায় না, কিন্তু তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। মিনাবের সেই শিশুদের রক্ত আর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন—এই দুই মিলে তেহরান এখন যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অনমনীয় মনোভাব এবং ব্রিটিশদের কৌশলগত সমর্থন এই আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছে।
লন্ডনের নীরবতা এই মুহূর্তে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইভেট কুপার কি তেহরানের এই হুঁশিয়ারিকে গুরুত্ব দেবেন, নাকি ওয়াশিংটনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে আরাগচির বার্তাটি ছিল পরিষ্কার: ব্রিটেনের মাটিতে মার্কিন বোমারু বিমানের জ্বালানি ভরা মানেই হলো ইরানের কামানের গোলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া।

