যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ (ভিওএ) নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত নির্বাহী আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন মার্কিন আদালত। এক বছর আগে হোয়াইট হাউসে ফেরার পরপরই ট্রাম্পের নির্দেশে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ছাঁটাই হওয়া শত শত সাংবাদিককে দ্রুত কর্মস্থলে পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।
ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট জজ রয়েস ল্যামবার্থ গত মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক রায়ে জানান, গত বছর ভয়েস অব আমেরিকা বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল পুরোপুরি আইনবহির্ভূত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের গণহারে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তটি ছিল ‘খামখেয়ালি ও মনগড়া’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি অপপ্রচার রুখতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থাটি ২০২৫ সালে বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ৫০টি ভাষায় তাদের পরিষেবা দিয়ে আসছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর ভয়েস অব আমেরিকার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘রেডিও ফ্রি ইউরোপ’ ও ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’র মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধের কবলে পড়ে।
ট্রাম্পের অনুগত হিসেবে পরিচিত ক্যারি লেককে ‘ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়া’র (ইউএসএজিএম) প্রধান নিযুক্ত করার পর প্রতিষ্ঠানটির চিত্র বদলে যায়। লেক দায়িত্ব নিয়েই সংস্থাটির ৮৫ শতাংশের বেশি কর্মীকে ছাঁটাই করেন, যার মধ্যে কেবল ভয়েস অব আমেরিকা থেকেই কাজ হারান এক হাজারের বেশি সংবাদকর্মী। হাতেগোনা কয়েকজন বাদে প্রায় সবাইকেই দাপ্তরিক কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি গত জুনে ইরানে আক্রমণের সময় সাময়িকভাবে ফিরিয়ে আনা পার্সিয়ান সার্ভিসের সংবাদিকদেরও পুনরায় বহিষ্কার করা হয়।
বিচারক ল্যামবার্থ তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ক্যারি লেকের এই বিশাল সংখ্যক কর্মীকে বরখাস্ত করার কোনো আইনি কর্তৃত্বই ছিল না। কারণ, মার্কিন সিনেটে তার নিয়োগ কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি। ফলে তার নেওয়া প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই আইনিভাবে অকার্যকর। তিন সাংবাদিকের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আসা এই রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা আবারও দৃশ্যমান হলো।
মামলাকারীদের অন্যতম সাংবাদিক প্যাটসি উইডাকুসওয়ারা আদালতের এই সিদ্ধান্তে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা আশা করি আমেরিকান জনগণ আমাদের সাংবাদিকতার মিশনকে সমর্থন করবে। আমরা কোনো অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডার অংশ হতে চাই না, সত্য প্রচারই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তবে আদালত এই যুগান্তকারী নির্দেশ দিলেও ‘ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়া’ এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমানে সংস্থাটির নেতৃত্বে রয়েছেন সারাহ রজার্স, তবে তার নিয়োগও এখনো সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ভয়েস অব আমেরিকার সদর দফতরে সাংবাদিকদের পদচারণা আবার শুরু হয় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম।

