মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ প্রকট হচ্ছে, ঠিক তখনই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থান জানান দিল তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি এবং নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে আরও ৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি-র এক বিবৃতিতে এই বড় ধরনের ধরপাকড়ের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, আটককৃতরা দেশজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের নীল নকশা সাজিয়েছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে, যারা সরাসরি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে কাজ করছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। কেবল ধরপাকড়ই নয়, ইরাক সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে পাঁচটি ‘সশস্ত্র ভাড়াটে চক্রকে’ নির্মূল করার দাবিও করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
এই গণ-গ্রেপ্তারের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির উত্তর অঞ্চলেও। আলবোর্জ প্রদেশে শত্রুপক্ষীয় নেটওয়ার্কগুলোতে স্পর্শকাতর যুদ্ধের ফুটেজ পাঠানোর অভিযোগে এর আগে ৪১ জনকে আটক করা হয়েছিল। ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বর্তমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হয়ে কাজ করা মোট ১৭৮ জন কথিত গুপ্তচরকে তারা খাঁচায় পুরেছে।
মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা নাকি ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সেন্টার এবং বিভিন্ন সামরিক চেকপোস্টের ছবি ও সুনির্দিষ্ট লোকেশন মার্কিন ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাচার করছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ড্রোন বা মিসাইল হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সহজ করতেই এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
আটকদের পরিচয় নিয়ে বিশদ তথ্য না দিলেও আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও রয়েছে। তল্লাশি চালিয়ে তাদের কাছ থেকে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, উন্নত লোকেশন শনাক্তকারী জিপিএস ডিভাইস, বিশেষায়িত যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এই সরঞ্জামগুলো সাধারণ কোনো অপরাধী চক্রের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট পেশাদার গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের পরিচায়ক।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কাতারের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তজনা বৃদ্ধির এই সময়ে গুপ্তচর ধরার এই খবর ইরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি অংশ হতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন তেলের বাজার সামাল দিতে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি দেখাচ্ছে।
বর্তমানে আটককৃতদের অজ্ঞাত স্থানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো চেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করা হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণ-গ্রেপ্তার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকটকে আরও গভীর করবে, যা কূটনৈতিক আলোচনার পথকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে পারে।

