বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে এবার কৌশলী অবস্থান নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সাগরে থাকা ইরানি তেলের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করার কথা ভাবছে বাইডেন প্রশাসন। বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং কাতারের গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে, তখন ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্কট বেসেন্ট জানান, কেবল ইরানি তেল নয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে তার নিজস্ব জরুরি মজুত (Strategic Petroleum Reserve) থেকেও বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়তে পারে। একতরফাভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই বেসেন্ট একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, মার্কিন প্রশাসনের নজরদারিতেই ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলো বর্তমানে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার জোগান সচল রাখতেই মূলত এই ‘মৌন সম্মতি’ দেওয়া হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার আইনি কাঠামোয় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে বা কতটা শিথিলতা দেখানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে, তেহরান এবং ওয়াশিংটনের এই স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। পেন্টাগনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর কোনো ধরনের হামলা বা উসকানি বরদাশত করা হবে না। ইরানকে ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আরব দেশগুলোতে অশান্তি সৃষ্টি করা তেহরানের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য এবং অর্থমন্ত্রীর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত—দুটোকে একসাথে দেখলে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন গাজর ও লাঠি (Carrot and Stick) নীতি অনুসরণ করছে। একদিকে তারা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দিচ্ছে যাতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ে, অন্যদিকে সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে লাগাম টানার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের রাস লাফানে হামলার পর যে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে ইরানি তেলের বিকল্প নেই। দীর্ঘদিনের শত্রুতা সরিয়ে রেখে কেবল বাজার স্থিতিশীল করার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘অপ্রত্যাশিত’ বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এই নমনীয়তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে পারস্য উপসাগরে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
বাজারের এই অস্থির সময়ে মার্কিন প্রশাসনের এমন ঘোষণা আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে আপাতত বিনিয়োগকারীরা তাকিয়ে আছেন ওয়াশিংটনের পরবর্তী দাপ্তরিক আদেশের দিকে। যদি সত্যিই ইরানি তেল বড় আকারে বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়, তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

