মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে এটিই তেলের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য।
হামলার প্রভাব কেবল তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়বে যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। এই জলপথটি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। এখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। বাজার বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ভান্দা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি জানিয়েছেন, ওমান ও দুবাইয়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ১৫০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
বন্দনা হরির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তাতে ব্রেন্ট বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) না হলেও অন্যান্য ক্যাটাগরির তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামীর বাজারদর সম্পূর্ণ নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচলের ওপর। সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা।
ইউরোপের চিত্র আরও ভয়াবহ। কাতারের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে হামলার খবর পৌঁছানোর পর ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দাম একলাফে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাদেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত ডাচ টিটিএফ প্রাকৃতিক গ্যাসের চুক্তিমূল্য বৃহস্পতিবার সকালে প্রতি ইউনিটে ৭৪ ইউরো পর্যন্ত উঠেছিল। যদিও পরে তা কিছুটা সংশোধন হয়েছে, তবুও অস্থিরতা কমেনি।
কাতারের রাস লাফান বিশ্বের বৃহত্তম তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। ইরানের উপর্যুপরি হামলায় এই শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামোয় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। রাস লাফান থেকে এলএনজি সরবরাহ থমকে যাওয়ার অর্থ হলো ইউরোপ এবং এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়া।
হামলার পর থেকেই সরবরাহ চেইন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শীতকাল পরবর্তী সময়ে যখন শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণোদ্যমে চালুর অপেক্ষায়, ঠিক তখনই জ্বালানির এই আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে। সরবরাহকারীরা এখন বিকল্প রুটের কথা ভাবলেও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কাতার ও ইরানের মধ্যে চলমান এই ছায়াযুদ্ধ এখন আর আঞ্চলিক সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে হামলার পর কাতার কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করার চেষ্টা করছে। তবে মেরামত কাজ শুরু করে পুনরায় স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কতটা সময় লাগবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের দামামা যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তত বাড়বে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলারে পৌঁছানো কেবল শুরু মাত্র। যদি ইরান তাদের সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করে এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখে, তবে বিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হবে।
লন্ডন ও নিউ ইয়র্কের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে আজ দিনভর জ্বালানি শেয়ারের ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারেও। ডলারের বিপরীতে অনেক দেশের মুদ্রার মান কমতে শুরু করেছে। এই অস্থিরতা যদি আগামী কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তবে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে সরাসরি।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে এই অস্থিরতা প্রশমনে এখনো বড় কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়েনি। বরং পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে উত্তাপ আরও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বশক্তিগুলো যদি দ্রুত হস্তক্ষেপ না করে, তবে জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। কাতারের গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর যে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছে, তা যদি দ্রুত নেভানো না যায়, তবে তার আঁচ লাগবে বিশ্বের প্রতিটি কোণায়। এখন সবার চোখ হরমুজ প্রণালি আর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমার দিকে—যেখান থেকে নির্ধারিত হবে আগামীর জ্বালানি মানচিত্র।

