মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ তীব্রতর হচ্ছে, তখন এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর কূটনৈতিক মোড় সামনে এল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে যে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন, তা মাঝপথে থামিয়ে না দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনকে এক প্রকার ‘চাপ’ দিচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। তাদের দাবি, যুদ্ধ যখন শুরুই হয়েছে, তখন যেন ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধূলিসাৎ করেই আমেরিকা ক্ষান্ত হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে তিনটি উপসাগরীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, আরব দেশগুলো নিজেরা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন কাজটা ‘শেষ’ করে ফেরে। তাদের প্রধান ভয় হলো, ইরানকে যদি এখনই পুরোপুরি দুর্বল করে দেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা এই অঞ্চলের তেল সরবরাহ ও অর্থনীতির জন্য স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
‘ইরান সব সীমা অতিক্রম করেছে’
দীর্ঘদিন ধরে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান এবং সুন্নি প্রধান আরব দেশগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চললেও সাম্প্রতিক সময়ে তা সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। সৌদি-ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, “উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইরান সব সীমা অতিক্রম করেছে। শুরুতে আমরা যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও, যখন তারা আমাদের ওপর হামলা শুরু করল, তখন তারা সরাসরি শত্রুতে পরিণত হয়েছে।”
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ব্যবহার করে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের বিমানবন্দর, বন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। এমনকি বিশ্ব তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের পথ ‘হরমুজ প্রণালি’তেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে তেহরান। এই ঘটনাগুলো আরব দেশগুলোর পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্পের ওপর দ্বিমুখী চাপ
এদিকে হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানে আঞ্চলিক দেশগুলোর সরাসরি সমর্থন চান। তিনি চাইছেন আরব দেশগুলোও যেন এই যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সঙ্গে কাঁধ মেলায়। এতে একদিকে যেমন অভিযানের আন্তর্জাতিক বৈধতা বাড়বে, তেমনি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের অবস্থান শক্ত হবে।
তবে আরব দেশগুলো এই ফাঁদে পা দিতে নারাজ। তারা চায় মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের ডানা ছেঁটে দেওয়া হোক, কিন্তু নিজেরা সরাসরি কোনো ফ্রন্টে নামতে আগ্রহী নয়। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, “আরব দেশগুলোর ভয় হলো, আমেরিকানরা যদি কাজ শেষ না করেই মাঝপথে সরে যায়, তবে আমাদের একাই ইরানের ভয়াবহ প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হবে।”
অবকাঠামো ও অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
উপসাগরীয় দেশগুলো বর্তমানে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন ও বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু ইরানের ক্রমাগত হামলা তাদের এই স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ইরানকে যদি এখনই অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাহীন করে দেওয়া না যায়, তবে তারা পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘ মেয়াদে জিম্মি করে রাখবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা কোনো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবে নিজেদের আকাশসীমা ও নিরাপত্তা রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই ছয়টি দেশ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছে। বড় ধরনের অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের আশঙ্কায় তারা এখনো কোনো সম্মিলিত সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
হোয়াইট হাউস অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং ইরানের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প কি আরব দেশগুলোর পরামর্শ মেনে ইরানের সামরিক শক্তির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকবেন, নাকি অন্য কোনো সমীকরণে যুদ্ধের গতিপথ বদলে যাবে।

