ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়ক উন্মোচিত হলো। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আহত ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কুয়েতভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল-জারিদার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ আমন্ত্রণে এবং ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে মোজতবা খামেনিকে মস্কো পাঠানো হয়েছে। গত ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন সংলাপ হয়। সেই আলোচনার রেশ ধরেই ওই দিনই একটি রুশ সামরিক বিমানে করে তেহরান ত্যাগ করেন মোজতবা।
ক্রেমলিনের নীরবতা ও রহস্য
এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলেও ক্রেমলিন এখন পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটেছে। আল-জারিদার পক্ষ থেকে রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ যখন পুতিনের প্রেস সেক্রেটারির কাছে বিস্তারিত জানতে চায়, তখন তিনি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি স্পষ্ট জানান, “এই ধরনের প্রতিবেদনের বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করি না।”
রুশ প্রশাসনের এই রহস্যময় নীরবতা আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ক্রান্তিকালে রাশিয়ার এই পদক্ষেপ দুই দেশের গভীর কৌশলগত সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
পটভূমি: এক ভয়াবহ হামলার ক্ষত
মোজতবা খামেনির এই চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রথম দিনেই এক বিধ্বংসী হামলায় নিহত হন মোজতবা খামেনির বাবা এবং ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেই হামলায় খামেনি পরিবারের বড় একটি অংশ প্রাণ হারায়, যার মধ্যে ছিলেন শরিফুল খামেনির মা, বোন এবং স্ত্রী।
সেই প্রাণঘাতী হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও গুরুতর আহত হন। বাবার মৃত্যুর পর তাকেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এতদিন ধোঁয়াশা ছিল। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো তার জখমকে ‘গুরুতর’ বলে বর্ণনা করলেও ইরানি সূত্রগুলো দাবি করছে, তিনি কেবল পায়ে আঘাত পেয়েছেন এবং তার জীবন সংশয়ের কোনো ঝুঁকি নেই।
রাশিয়া-ইরান অক্ষ ও বর্তমান বাস্তবতা
২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদারিত্বের চুক্তির পর রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মস্কো যে তেহরানের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, মোজতবা খামেনিকে চিকিৎসার জন্য গ্রহণ করা তারই বড় প্রমাণ। মস্কোর হাসপাতালে তার এই অবস্থানকে কেবল চিকিৎসার খাতিরে নয়, বরং নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এক রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবেও দেখছেন অনেক সমর বিশেষজ্ঞ।
তেহরানের রাজনৈতিক আকাশে যখন অনিশ্চয়তার মেঘ, তখন নতুন নেতার মস্কো যাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, বিশ্ব এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে।

