দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের কাঠামো নির্ধারণে প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো অবস্থানে যাচ্ছে না বিরোধী দল। বরং জাতীয় সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের পর এই বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার কৌশল নিয়েছে তারা। রোববার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় সংসদের বৈঠক শুরু হওয়ার আগে সংসদ ভবনের লবিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আজহারুল ইসলাম। তিনি জানান, সংসদের আজকের কার্যসূচিতে প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই বিতর্কে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত নির্যাস থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিরোধী জোট।
ত্রয়োদশ সংসদের এই অধিবেশনটি নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য আলাদা কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কমিটি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তির কাজ শেষ করবে। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংসদে যে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনেকখানি।
শনিবার অনুষ্ঠিত কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। রোববার থেকেই এই দীর্ঘ আলোচনার সূচনা হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনপ্রণেতারা রাষ্ট্রপতির দিকনির্দেশনামূলক ভাষণের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনের বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে বিতর্ক করবেন। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন বিকেল ৩টায় অধিবেশন চলবে এবং ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই অধিবেশন দীর্ঘায়িত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধী দলের এই ‘ধীরে চলো’ নীতি মূলত দরকষাকষির একটি অংশ। তারা দেখতে চাচ্ছে সরকার সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী মতকে কতটা গুরুত্ব দেয়। এটিএম আজহারুল ইসলামের বক্তব্যেও সেই আভাস পাওয়া গেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সংসদের ভেতরে আলোচনার পরিবেশ এবং সরকারের সদিচ্ছা পর্যবেক্ষণ করেই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
গত ১২ মার্চ জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হয়। এরপর রোববার পর্যন্ত মুলতবি থাকার পর আজ থেকে পুরোদমে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছর পর সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং নীতি নির্ধারণী বিষয়ে তাদের এই অনড় অবস্থান দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংবিধান সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করে সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এখন সবার নজর সংসদ কক্ষের দিকে—সেখানে আলোচনার টেবিলে কী উঠে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধী দল কোন পথে হাঁটে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

