মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে, তখন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পারদ চড়ল আরও এক ধাপ। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যা’ করার প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। রোববার আইআরজিসি’র পক্ষ থেকে আসা এই কড়া বার্তা পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইআরজিসি পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ‘সেপাহ নিউজ’ এক বিবৃতিতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বিবৃতিতে নেতানিয়াহুকে ‘শিশু হত্যাকারী অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, আইআরজিসি তাদের পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাকে তাড়া করবে এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু নিশ্চিত করবে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই হুমকি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন নেতানিয়াহুর বর্তমান অবস্থান এবং শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। গত কয়েকদিন ধরে তাকে জনসমক্ষে দেখা না যাওয়ায় ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা।
এই রহস্যের আগুনে ঘি ঢেলেছে গত ১২ মার্চ নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত ভিডিও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল ৭৬ বছর বয়সী এই নেতার প্রথম ভিডিও বার্তা। কিন্তু ভিডিওটিতে নেতানিয়াহুর হাতের আঙুল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তোলপাড়। নেটিজেনদের দাবি, ভিডিওর এক পর্যায়ে তার হাতে পাঁচটি নয়, বরং ছয়টি আঙুল দেখা গেছে।
এই অসঙ্গতি দেখে অনেকেই সন্দেহ করছেন যে, ভিডিওটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা কোনো ‘ডিপফেক’ কন্টেন্ট। যদিও পরবর্তীতে কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এবং আলোর প্রতিফলনের কারণে এমনটি মনে হতে পারে। কিন্তু মার্কিন রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যান্ডেস ওয়েনসের মতো অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে এ ধরনের বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ করতে হলো এবং কেনই বা পরে তা সরিয়ে নেওয়া হলো?
নিখোঁজ রহস্য কেবল প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন, গত ৯ মার্চের পর থেকে সম্পূর্ণ নীরব। এক্স-এ তার প্রায় তিন লাখ অনুসারী থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তার কোনো পোস্ট না থাকায় সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ভেতরেও এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসা তথ্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে নেতানিয়াহুর কার্যালয় তার মৃত্যুর খবরকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। তবে এই মৌখিক আশ্বাসের বাইরে এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহুর কোনো সরাসরি উপস্থিতি বা লাইভ ব্রিফিং দেখা যায়নি।
মজার বিষয় হলো, বিতর্কিত সেই ভিডিওতে নেতানিয়াহু নিজেও বেশ আক্রমণাত্মক ছিলেন। তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে হত্যার পরোক্ষ হুমকি দিয়েছিলেন। হিব্রু ভাষায় দেওয়া সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েল বর্তমানে ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, এই পরিবর্তন ভেতর থেকে আসবে নাকি বাইরে থেকে, তা সময়ই বলে দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর মতো একজন ঝানু রাজনীতিকের এভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া এবং ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি হত্যার হুমকি আসা—দুটি ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাত এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে। একে অপরের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রবণতা যুদ্ধকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসযজ্ঞের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইরান এবং ইসরায়েলের এই পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের ময়দানে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের আস্ফালন দিন দিন বাড়ছেই। এর মাঝে নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া এই নাটকীয়তা বিশ্ব গণমাধ্যমে নতুন আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। তিনি কি সত্যিই কোনো গোপন বাঙ্কারে নিরাপদ আছেন, নাকি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ অন্য কারো হাতে চলে গেছে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ধরনের সরাসরি হত্যার হুমকি বিরল হলেও, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে তা নতুন কিছু নয়। আইআরজিসি’র এই বিবৃতি আসলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের এক ধরনের প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ইসরায়েল এই হুমকির জবাবে তাদের প্রধানমন্ত্রীর নতুন কোনো বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও বা বিবৃতি সামনে আনে কি না।
পরিশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ এখন যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনি পুরো অঞ্চলের শান্তিও ঝুলছে এক সুতোর ওপর। যুদ্ধের ময়দানে জয়ের চেয়ে এখন যেন একে অপরের অস্তিত্ব মুছে ফেলার লড়াইটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

