মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। দীর্ঘদিনের ছায়া যুদ্ধ ছাপিয়ে সরাসরি সংঘাতের যে প্রেক্ষাপট গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছিল, তা এবার এক ভয়াবহ মোড় নিল। রোববার ভোরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদের জনবহুল এলাকা লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা চারটি ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি, তবে এই হামলা রিয়াদবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরবে এটি অন্যতম বড় আকাশপথের অনুপ্রবেশ।
রাজধানীর আকাশে যখন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরের অন্য প্রান্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সাইরেন বেজে ওঠে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা আমিরাতের আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে অন্তত ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও একঝাঁক ড্রোন ছুঁড়েছে। এই ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
সংঘাতের এই বিস্তৃতি কেবল সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থানগুলো এখন ইরানের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবে এ পর্যন্ত অন্তত দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই সংঘাতের শেষ কোথায়?
এদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে অন্তত শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ জানিয়েছে, ১০৮ জন আহত ব্যক্তিকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেটের আঘাতে আহত হয়েছেন।
তবে আহতদের বড় একটি অংশ কেবল সরাসরি হামলার শিকার হননি। সাইরেনের শব্দে প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে বা পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন অনেকে। জনমনে বিরাজমান এই চরম অস্থিরতা আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক রূপ প্রকাশ করছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১৯৫ জন চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে এই আক্রমণকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলি ও মার্কিন তৎপরতার জবাব দিতেই তারা এই পথ বেছে নিয়েছে বলে দাবি করছে তেহরান। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এবং তার মিত্ররা এই হামলাকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখছে। আল-ধাফরা ঘাঁটিতে হামলার পর পেন্টাগন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ত্রিভুজাকৃতি সংঘাত—ইরান, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশসমূহ—বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সৌদি আরবের তেল ক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা ঘাঁটিতে হামলাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আমিরাত দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই নিরাপদ নয়। আইআরজিসি’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষের আস্তানাগুলোতে তাদের আঘাত হানার সক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল।
রিয়াদ এবং আবুধাবিতে যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে, তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থমকে গেছে। স্কুল-কলেজ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার কমেছে। মানুষ এখন টেলিভিশনের পর্দা আর সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলোতে চোখ রাখছে পরবর্তী কোনো সাইরেনের অপেক্ষায়। যুদ্ধের এই বিভীষিকা যেন ডালপালা মেলে পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করতে চাইছে।
ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোববার এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছে, বর্তমানে ৮১ জন রোগী হাসপাতালের আইসিইউ এবং সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে যে পরিমাণ হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল, সময়ের সাথে সাথে সেই সংখ্যা আরও বাড়ছে। লেবানন সীমান্ত থেকেও রকেট হামলা অব্যাহত থাকায় ইসরায়েলের উত্তর ও কেন্দ্রীয় অঞ্চল এখন উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
মানবিক দিক থেকে বিচার করলে, এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের সীমানা পরিবর্তন করছে না, বরং হাজার হাজার মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই দেশগুলোতে কাজ করেন, যাদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন তাদের পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি আরব ও আমিরাতে কর্মরত আছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও তার কোনো প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। বরং ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা এই বৈরিতা আরও নতুন নতুন ফ্রন্ট উন্মোচন করছে। ইয়েমেন, লেবানন এবং সিরিয়ার পর এখন সরাসরি সৌদি-আমিরাত ভূখণ্ডে হামলা প্রমাণ করে যে, ছায়া যুদ্ধ এখন সরাসরি সম্মুখ সমরে রূপান্তরিত হয়েছে।
রোববারের এই হামলাগুলোর পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে আরও উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা চাইতে পারে। অন্যদিকে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির প্রদর্শনী অব্যাহত রেখে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে।
সংঘাতের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের দামামা যত জোরেই বাজুক না কেন, শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষরণ সাধারণ মানুষেরই হয়। রিয়াদের রাজপথ থেকে শুরু করে আল-ধাফরা ঘাঁটির আশেপাশে বসবাসকারী বেসামরিক নাগরিক—সবাই এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিশ্বনেতারা কি পারবেন এই আগুনের শিখা নেভাতে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগিয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।

