বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে নিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তারা নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তারা। এর মাধ্যমে তারা স্পষ্ট করে দিলেন যে, সংসদের ভেতরে তারা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধি নন, বরং সমগ্র হাউসের নিরপেক্ষ পরিচালক।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দলের ‘আইন বিষয়ক সম্পাদক’ পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক নৈতিকতা বজায় রাখতেই তাদের এই পদক্ষেপ বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর পাঠানো পদত্যাগপত্রে মেজর হাফিজ উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হওয়া তার জন্য এক বিশাল গৌরবের বিষয়। তবে এই পদের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি স্বেচ্ছায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে পদত্যাগ করছেন।
অনুরূপ কারণ দর্শিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামালও। তিনি জানান, সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় যেন কোনোভাবেই দলীয় সংকীর্ণতা তাকে স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্যই এই আইনানুগ ও নৈতিক সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী—রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সম্পূর্ণ নির্দলীয় বা সাংবিধানিক পদ হিসেবে গণ্য। সংবিধানে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, এসব উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদ-পদবিতে থাকতে পারবেন না।
সংবিধানের ৫০(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য থাকেন না। এমনকি কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকেই তার সংসদ সদস্য পদটি শূন্য হয়ে যায়। যদিও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকে, তবে কার্যক্রম পরিচালনার সময় তাদের দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়।
সংবিধানের ৭৪ ও ৭৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হন। তবে পবিত্র সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। আজকের এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তারা সেই আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সংসদীয় শিষ্টাচারের প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেন।
সংসদ সচিবালয়ের সূত্রগুলো বলছে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের এই পদত্যাগ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি সংসদীয় বিতর্কে ভারসাম্য রক্ষার একটি শক্তিশালী বার্তা। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে, সেখানে এই নিরপেক্ষ অবস্থান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বিকেলের দিকে পদত্যাগপত্রগুলো দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছালে বিএনপির পক্ষ থেকেও একে স্বাগত জানানো হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের হাত আরও শক্তিশালী হবে এবং সব দলের সদস্যরা সমান সুযোগ পাবেন।
আজকের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের লড়াকু এই দুই নেতা সংসদীয় আসনে বসে কতটুকু নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন। তবে প্রথম দিনেই তাদের এই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করেছে।

