বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আজ বুধবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে তারা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে গণ্য করেন। ফলে জাতীয় সংসদে তার বক্তব্য দেওয়ার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার নেই বলে তারা মনে করেন।
বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকটি মূলত আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের কৌশল নির্ধারণের জন্য ডাকা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আগামী দিনের সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডা. তাহের বলেন, আগামীকালের সংসদ অধিবেশনে তাদের দলের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবারের সংসদে বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ সদস্যই নতুন এবং তরুণ। ফলে সংসদের শিষ্টাচার, চরিত্র এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের করণীয় সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ নেতারা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তরুণ এমপিদের জন্য সংসদীয় রীতিনীতি বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহেরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বর্তমান রাষ্ট্রপতির ভূমিকা। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতি বিগত স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তার মতে, জনগণের ম্যান্ডেটহীন একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে সংসদ কোনো দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ আশা করতে পারে না। এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
মজার বিষয় হলো, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অবস্থানের প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন এই জামায়াত নেতা। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি কেন এই রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াতে চাইছে, তা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে এই কৌশলগত ভিন্নতা নিয়ে তিনি ধোঁয়াশা রেখে বলেন, “আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আপনারা আগামীকাল সংসদ অধিবেশন শুরু হলেই সরাসরি দেখতে পাবেন।”
ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টি নিয়েও বিরোধী শিবিরে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। এই পদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ডা. তাহের জানান, আগামীকাল যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে, তখনই তারা তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে কেউ এই পদে আসছেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান সংসদের ভেতরে ও বাইরে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে বিএনপি যখন সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে জামায়াত সরাসরি রাষ্ট্রপতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজপথের উত্তাপ সংসদে নিয়ে আসতে চাইছে। এটি অন্তর্বর্তীকালীন পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি করছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, কালকের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ওয়াকআউটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিরোধী দলের এই নতুন কৌশল সরকারি ও বিরোধী বেঞ্চের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের জন্ম দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডা. তাহেরের ভাষ্যমতে, এবারের সংসদ অধিবেশনে তাদের মূল লক্ষ্য হবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তারা চান না কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কোনো চিহ্ন সংসদীয় কাঠামোর ভেতর অবশিষ্ট থাকুক। তাদের এই ‘ক্লিন স্লেট’ রাজনীতি আগামী দিনে সংসদকে কতোটা কার্যকর করবে, নাকি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
বিগত দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই সংসদ অধিবেশনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট বা বিরোধিতা করার মাধ্যমে বিরোধী দল কি জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করছে? নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে কালকের অধিবেশনের প্রথম ঘণ্টাগুলোতেই।
শেষ মুহূর্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্যও জামায়াতের এই অবস্থানের প্রতি মৌন সমর্থন জানিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কালকের অধিবেশনে তারা সম্মিলিত কোনো পদক্ষেপ নেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রাজপথের আন্দোলনের পর সংসদের ভেতরকার এই লড়াই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ভাষণ একটি আনুষ্ঠানিক রীতি হলেও, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা এক বিশাল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডা. তাহেরের আজকের এই মন্তব্য সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। এখন দেখার বিষয়, কালকের সূর্যোদয়ের পর সংসদ কক্ষের ভেতর কী নাটকীয়তা অপেক্ষা করছে।

