মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আরও তীব্র করে তুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে তেহরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল চলতেই থাকবে না, বরং প্রয়োজনে তা অনির্দিষ্টকাল দীর্ঘায়িত হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পিবিএস নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই কড়া বার্তা দেন।
আরাগচির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে, ইরানে চলমান যুদ্ধ খুব শীঘ্রই সমাপ্তির দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এই আশাবাদকে কার্যত তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন আরাগচি। তাঁর ভাষায়, “মাঠে এখনো গোলাগুলি চলছে এবং আমাদেরও পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। শত্রুকে আঘাত করার জন্য আমরা ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত। এই লড়াইয়ে যতদিন সময় লাগে, আমরা লড়ব।”
এই যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় যে কূটনৈতিক বোমাটি আরাগচি ফাটিয়েছেন, তা হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। তিনি স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সংলাপে বসার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ইরানের নেই। তিনি বলেন, “মার্কিনিদের সঙ্গে আমাদের অতীত আলোচনার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিতা। আমরা আর সেই ব্যর্থ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাই না। আলোচনার বিষয়টি এখন আর আমাদের এজেন্ডাতেই নেই।”
উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন পরমাণু প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্নায়ুক্ষয়ী আলোচনা চলেছিল। কিন্তু কোনো প্রকার সমঝোতা ছাড়াই সেই সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার ঠিক পরদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে শুরু করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইসরায়েলও শুরু করে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’।
যুদ্ধের শুরুর দিনটি ছিল ইরানের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির দিন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। বর্তমানে তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে নিয়মিত বিমান হামলা চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী। জানা গেছে, এতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং তেল ডিপোগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এত ক্ষয়ক্ষতির পরেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে লক্ষ্য নিয়ে এই আগ্রাসন শুরু করেছিল, তা ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইরানকে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়নি বলেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধারা অব্যাহত রাখতে পারছে তেহরান। আরাগচির এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত অদূর ভবিষ্যতে থামার কোনো লক্ষণ নেই; বরং এটি এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পর আরাগচির এই কট্টর অবস্থান মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি তেহরানকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাঘের মতো আরও হিংস্র করে তুলেছে।

