মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে এবার সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখ সমরের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে ইরান। দেশটির শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন রণতরীর মুখোমুখি হতে পুরোপুরি প্রস্তুত। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাইনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
নাইনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ইরান প্রজাতন্ত্রের জানবাজ বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনী এবং তাদের বিশাল বিমানবাহী রণতরী ‘জেরাল্ড ফোর্ড’-এর জন্য অপেক্ষা করছে।” আইআরজিসি-র এই মন্তব্যকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এই হুমকির রেশ কাটতে না কাটতেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও কড়া বার্তা এসেছে। সোমবার ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য যেকোনো মূল্যে ‘নিরাপদ’ রাখা হবে। তেহরানকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধের দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের ওপর বর্তমানের চেয়ে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। এছাড়া প্রয়োজনে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহাড়ায় (এসকোর্ট) গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে মার্কিন এই হুমকিকে পাত্তাই দিচ্ছে না তেহরান। জেনারেল নাইনি পাল্টা জবাবে বলেন, “যতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের সংঘাতের নিষ্পত্তি না হচ্ছে, ততদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক লিটার তেলও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে যেতে দেওয়া হবে না।” তাঁর এই ঘোষণা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করা এই হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় বিশ্বের ‘জ্বালানি প্রবেশদ্বার’। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানির লাইফলাইন হলো এই রুট। ফলে এখানে সামান্যতম অস্থিরতা মানেই বিশ্বজুড়ে তেলের দামের আকাশচুম্বী উল্লম্ফন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন রূপ নেয়। ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত ১০ দিনে এই প্রণালিতে অন্তত ১০টি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আইআরজিসি ইতিমধ্যে এই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে হরমুজ প্রণালি এখন এক বিশাল ‘বারুদের স্তূপে’ পরিণত হয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের পেশিশক্তি প্রদর্শনের নীতি, অন্যদিকে ইরানের ‘তেল অবরোধ’ করার হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার বিষয়, মার্কিন রণতরী জেরাল্ড ফোর্ড এই জলপথে প্রবেশ করলে আইআরজিসি তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেয়।

