মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ মোড় নিল। প্রথমবারের মতো ইরানের হৃদপিণ্ড তেহরানের কৌশলগত তেল ডিপো এবং শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। এই হামলার ফলে ইরানের রাজধানীতে এখন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ভূগর্ভস্থ ড্রেন এবং পয়ঃনিষ্কাশন নালা দিয়ে প্রবাহিত হওয়া জ্বালানি তেল পুরো শহরজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা একে বর্ণনা করছেন “আগুনের নদী” হিসেবে।
হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ক্ষতিগ্রস্ত ডিপো থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি ও দাহ্য পদার্থ তেহরানের প্রধান নিষ্কাশন ব্যবস্থার মিশে যায়। এরপরই পুরো শহরের রাস্তার পাশের নালাগুলোতে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে তেহরানের রাজপথের ধার ঘেঁষে মাইলের পর মাইল এলাকা দাউ দাউ করে জ্বলছে। বাতাসের কালো ধোঁয়া আর আগুনের তাপে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের সংস্কৃতি ও শিল্পবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘লিভিং ইন তেহরান’ থেকে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকার ঠিক পাশ দিয়েই আগুনের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও নালাগুলোতে জমে থাকা তেলের কারণে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ইরানের তেল মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, শুধু তেহরান নয়, বরং পশ্চিমাঞ্চলীয় আলবোর্জ প্রদেশের কারাজ শহরসহ মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনী। এই হামলার ফলে ইরানের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যেই দেশটির সরকার সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি কোটা কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে, যা জনজীবনে স্থবিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তেল আবিবের পক্ষ থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, এই হামলা কেবল শুরু। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করতে পারে এমন প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু এখন ইসরায়েলি রাডারে রয়েছে। কোহেনের মতে, যুদ্ধের এই পর্যায়টি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান থামবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল স্থাপনায় এই সরাসরি হামলা ইরান-ইসরায়েল ছায়া যুদ্ধকে একটি প্রকাশ্য এবং ধ্বংসাত্মক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসরায়েলি জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, তারা মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন করতে চায়। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইসরায়েল এমন কোনো পরিস্থিতি চায় না যেখানে এই সংঘাত আরও এক বা দুই বছর ঝুলে থাকে। বরং তারা দ্রুত এবং চূড়ান্ত একটি আঘাতের মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান খুঁজছে।
এদিকে পাল্টা হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েলের ভেতরেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও তার মিত্রদের সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ৯২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। যদিও সরাসরি হামলায় আহতের সংখ্যা কম, তবে বড় একটি অংশ নিরাপদ আশ্রয়ে বা ‘শেল্টারে’ যাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে আহত হয়েছেন। ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
তেহরানের এই অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি সামরিক জয় বা পরাজয়ের গল্প নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়েরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। শহরের ড্রেনগুলো যখন আগুনের নর্দমায় পরিণত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তার ওপর। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই বিশাল পরিমাণ তেল পুড়ে যাওয়ায় তেহরানের বায়ু এবং পানি দীর্ঘমেয়াদী দূষণের শিকার হবে।
ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলার কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। দেশটির সামরিক কমান্ডারেরা বলছেন, ইসরায়েলের এই দুঃসাহসের চড়া মূল্য দিতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে জাতিসংঘ ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলো এই উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যেই এই হামলার খবরে বাড়তে শুরু করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ড্রোনের গুঞ্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে ভারী। তেহরানের রাজপথে বয়ে চলা আগুনের নদী যেন সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি। এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, নাকি এটি বৃহত্তর কোনো বিশ্ব সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আপাতত তেহরান জ্বলছে, আর সেই আগুনের তাপ অনুভূত হচ্ছে পুরো পৃথিবীতেই।

