ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও পর্দার অন্তরালের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একইসঙ্গে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে ‘লন্ডন কন্সপিরেসি’র জনক ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের জোর দাবি তুলেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান জামায়াতের নায়েবে আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। নির্বাচনে কারচুপি এবং সাবেক উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে দলটির এই কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহের বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে বাইরে থেকে অংশগ্রহণমূলক মনে হলেও পর্দার আড়ালে ছিল গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা থেকেই কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং ব্যালট পেপারে গণহারে সিল মারার খবর আসতে থাকে। প্রায় ৫৩টি আসনে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করেছে এবং এ নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ডা. তাহের তাঁকে ‘স্বঘোষিত রাজসাক্ষী’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “রিজওয়ানা হাসান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট আদর্শের শক্তিকে মূলধারায় আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে আমরা শুরু থেকে যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলে আসছিলাম, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।”
জামায়াত নেতার দাবি, তৎকালীন সরকার বা তার কোনো প্রভাবশালী অংশ পরিকল্পিতভাবে ডিসি, এসপি ও প্রিসাইডিং অফিসারদের ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট দলকে জেতানোর নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছে। এই ষড়যন্ত্রের গভীরে কী ছিল এবং কারা এতে সরাসরি যুক্ত ছিল, তা বের করতে রিজওয়ানা হাসানকে অবিলম্বে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের কড়া সমালোচনা করা হয়। ডা. তাহের তাঁকে ‘মীর জাফর’ ও ‘লন্ডন কন্সপিরেসি’র হোতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন তিনি নিরপেক্ষতার শপথ ভঙ্গ করে একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করেছেন। সেই ষড়যন্ত্রের পুরস্কার হিসেবেই আজ তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন, যা নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।”
বিএনপির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় উপনেতা বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, কেন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিএনপির কি এতটাই জনবল সংকট যে খলিলুর রহমানের মতো ব্যক্তিকে মন্ত্রী করতে হলো? যাঁর বিরুদ্ধে খোদ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাই আগে সরব ছিলেন, তাঁর সাথে পর্দার আড়ালে কী চুক্তি হয়েছে তা জাতির জানা প্রয়োজন।”
জামায়াত নেতারা মনে করেন, গত ৫৬ বছরে এ দেশের মানুষ একটি সত্যিকারের সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করেছে, কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে খলিলুর রহমানকে পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে এবং রিজওয়ানা হাসানকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনিরসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

