একুশের সকাল মানেই স্মৃতির মিনার অভিমুখে মানুষের এক অন্তহীন মিছিল। সেই মিছিলে শামিল হয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁক বদল এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলেন।
আবদুস সালাম তাঁর বক্তব্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি সংগ্রামের চেতনাকে একই সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় জীবনে ৫২, ৭১, ৯০ এবং ২৪—এই চারটি সাল কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এগুলো আমাদের অস্তিত্বের একেকটি স্তম্ভ। এই সংগ্রামের বীর শহীদদের ত্যাগই আমাদের আগামীর পথ দেখাবে।”
১৭ বছরের দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, রক্তক্ষয়ী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আজ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, এবারের একুশ পালনের প্রেক্ষাপট অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। কারণ, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
আবদুস সালাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “৫২-এর ভাষা শহীদ আর ৭১-এর বীর শহীদদের আমরা যেভাবে হৃদয়ে ধারণ করি, ঠিক একইভাবে ৯০ এবং ২৪-এর শহীদদের চেতনাও আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রেরণা জোগাবে। তাঁদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। এটিই হবে আমাদের আগামীর অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।”
বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ও জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে তিনি জানান, জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে, তা মানুষের প্রতিটি আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশেষ করে বিএনপি ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুখী, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই এই সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিভাজন সরিয়ে রেখে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সব দল, মত ও পথের মানুষকে আজ এক কাতারে আসতে হবে। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে মানুষের অধিকার থাকবে সুরক্ষিত। মহান একুশের মূল সুরই ছিল অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। সেই চেতনাকে ধারণ করেই আমরা শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই।” তাঁর বক্তব্যে ফুটে ওঠে এক সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন।
দেশের প্রতিটি নাগরিককে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা উস্কানি যেন অর্জিত গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানান তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যেও তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেন।
আবদুস সালামের এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৫২ থেকে ২৪-এর এই ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বান মূলত নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকেই ধারণ করছে। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা—এটিই ছিল আজকের সকালে তাঁর প্রধান বার্তা।
শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেষার্ধে দেশের মানুষের প্রতি আশ্বাসের বাণী শোনান। তিনি বলেন, “শহীদদের রক্তস্নাত এই পথ কখনো ভুল হওয়ার নয়। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বীর শহীদদের প্রতিটি ফোঁটা রক্তের মর্যাদা আমরা রক্ষা করব এবং তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়বই।”

