বাইশ গজে তাদের লড়াই ছিল কিংবদন্তিতুল্য, কিন্তু মাঠের সেই বৈরিতা আজ এক গভীর মানবিক আবেদনে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ক্রমাগত অবনতিশীল স্বাস্থ্য এবং কারাবন্দি জীবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের ১৪ জন প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেট অধিনায়ক। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে তারা ইমরানের জন্য ‘মর্যাদা ও মৌলিক মানবিক অধিকার’ নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেলের খসড়া করা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ভারতের সুনিল গাভাস্কার ও কপিল দেবের মতো মহাতারকারা। তালিকায় আরও রয়েছেন ক্লাইভ লয়েড, অ্যালান বর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, মাইকেল অ্যাথারটন, নাসের হুসেইন ও ডেভিড গাওয়ারের মতো বিশ্বজয়ী অধিনায়কেরা। এমনকি নারী ক্রিকেটের কিংবদন্তি বেলিন্ডা ক্লার্ক এবং নিউজিল্যান্ডের জন রাইটও এই মানবিক আবেদনে শামিল হয়েছেন।
চিঠির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বর্তমানে কারারুদ্ধ ইমরান খানের চোখের গুরুতর সমস্যা এবং চিকিৎসার অভাব। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে ৭০োর্ধ্ব এই নেতার দৃষ্টিশক্তি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। স্বাক্ষরকারীরা অনুরোধ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতভেদ পাশে রেখে তাকে যেন অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত পারিবারিক সাক্ষাৎ এবং একটি স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার দাবিও জানানো হয়েছে এই চিঠিতে।
সাবেক এই বিশ্বসেরা ক্রিকেটাররা চিঠিতে ইমরানের ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি স্মরণ করেন। তারা উল্লেখ করেন, ইমরান খান কেবল পাকিস্তানের নন, বরং পুরো ক্রিকেট বিশ্বের একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার ন্যূনতম মানবিক অধিকার রক্ষা করা পাকিস্তান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন।
ইমরানের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তার ক্রিকেটীয় অবদান যে তর্কের ঊর্ধ্বে, সেটিই ফুটে উঠেছে এই চিঠির ছত্রে ছত্রে। এর আগে ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস ও শোয়েব আখতারের মতো পাকিস্তানি তারকারাও তাদের সাবেক ‘ক্যাপ্টেন’-এর সুচিকিৎসা দাবি করেছিলেন। এবার সেই দাবির সাথে যোগ হলো বৈশ্বিক ক্রিকেটের সবচাইতে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরগুলো।
চিঠির সমাপনী বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। সেখানে বলা হয়েছে, “ক্রিকেট দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। মাঠের লড়াই শেষ হয়ে গেলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা চিরকাল টিকে থাকে। ইমরান খান সেই স্পোর্টিং স্পিরিট বা খেলোয়াড়ি চেতনারই প্রতীক। কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা যেন সেই চেতনার মর্যাদা রক্ষা করেন।”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন ইমরানের কারাবাস নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটের এই মহাতারকাদের সম্মিলিত অবস্থান পাকিস্তান সরকারের ওপর এক নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করল। মাঠের জাদুকর থেকে রাজনীতির লড়াকু সৈনিক—ইমরান খানের জীবনের এই কঠিন সময়ে তার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীরাই আজ তার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আবির্ভূত হলেন।

