একই দিনে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথ গ্রহণ করে দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র ১১ দলীয় জোট। তবে নবনির্বাচিত সরকারি দল বিএনপি কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শপথ অনুষ্ঠান শেষে সংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি একে ‘জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা’ করার শামিল বলে অভিহিত করেন।
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি কোনো সাধারণ নির্বাচন ছিল না; এটি অর্জিত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদানদের রক্ত এবং আহতদের ত্যাগের বিনিময়ে। তাই জুলাই চার্টার এবং গণভোটের প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ হওয়ার কথা, তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।
জামায়াত আমির ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে জানান, সংসদ সচিবালয়ের দাওয়াতনামায় দুটি শপথের কথাই উল্লেখ ছিল। কিন্তু সকালে সরকারি দলের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। দুপুরে যখন জামায়াত ও মিত্র জোটের সদস্যরা আসেন, তখন সংসদ সচিব তাদের কাছে সরকারি দলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে জানতে চান তারা কী করবেন। জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা দুটি শপথই নেবেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কেন দুটি শপথ নিলাম? কারণ আমরা মনে করি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো আমাদের পবিত্র রাজনৈতিক দায়িত্ব। আমরা ওই শহীদদের রক্তকে বেইমানি করতে পারি না যাদের কারণে আজকের এই সংসদ। অথচ সরকারি দল ওই শপথ না নিয়ে জুলাইকে উপেক্ষা করেছে বলে আমরা মনে করি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় খোদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন ক্ষমতায় এসে সেই সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকা বা দ্বৈত শপথ এড়িয়ে যাওয়া তাদের দ্বিমুখী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। জামায়াত আমির দাবি করেন, সরকার যদি সত্যিই সংস্কারকে ধারণ করে, তবে তাদের দ্রুতই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে এই শপথ নেওয়া উচিত।
সরকারি দলের এই অবস্থানের প্রতিবাদে এবং জুলাই বিপ্লবের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিকেলে আয়োজিত মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত ও তাদের জোট। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বিকেলের শপথ অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আমাদের কার্ড দেওয়া হয়েছিল, মানসিক প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু যারা জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের অশ্রদ্ধা করে, তাদের অনুষ্ঠানে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটি আমাদের জন্য একটি আফসোসের জায়গা হয়ে থাকল।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে স্বীকৃতি না দিয়ে এই সংসদ কোনো গৌরবের আসনে বসতে পারবে না। জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সংস্কারের পক্ষে তাদের অনড় অবস্থান বজায় রাখবে বলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। দেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে এই শপথ বিতর্ক যে বড় ধরনের উত্তাপ ছড়াবে, জামায়াত আমিরের আজকের এই ক্ষুরধার বক্তব্যে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

