রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে সকাল থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। একের পর এক নাটকীয় মোড় আর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির অবস্থান। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দলটির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা এই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
নির্বাচনে জয়ী এনসিপির ছয়জন সদস্যই এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাদের শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তবে এই শপথ কেবল সংসদ সদস্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা একইসঙ্গে বিতর্কিত ও আলোচিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এই দ্বৈত শপথকে কেন্দ্র করেই মূলত গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলেছিল।
সকাল পর্যন্ত দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। এনসিপির ভেতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছিল, দলটির নির্বাচিতরা হয়তো এখনই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। বিএনপির জয়ী সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে অস্বীকৃতি জানানোয় এনসিপির মধ্যেও দ্বিধা তৈরি হয়েছিল। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখতে চেয়েছিলেন এবং মিত্র দলগুলোর সিদ্ধান্তের সাথে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই দ্বিধা মূলত কৌশলগত ছিল। তারা দেখতে চাচ্ছিল প্রধান বিরোধী পক্ষগুলো কোন পথে হাঁটে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ছিল। সকালে জামায়াত জানিয়েছিল তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। কিন্তু দুপুরের দিকে নাটকীয় পরিবর্তন আসে তাদের সিদ্ধান্তে। জামায়াত সদস্যরা দ্বৈত শপথ নিলে এনসিপির ওপর থেকেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ কমে যায়।
এর পরপরই এনসিপির ছয় নির্বাচিত প্রতিনিধি সংসদ ভবনে উপস্থিত হন। তাদের চোখে-মুখে ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ক্লান্তিও স্পষ্ট ছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার যখন তাদের শপথ পড়ান, তখন উপস্থিত সবার মনোযোগ ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদের অংশের ওপর। কারণ, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমে এনসিপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলো। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন, সংসদের ভেতরে থেকে কথা বলাটাই এখন সময়ের দাবি। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি আইনসভার ভেতরে নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। গত কয়েকদিন ধরে দলের ভেতরে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। সংসদ সদস্যরা একদিকে যেমন জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে দলের রাজনৈতিক আদর্শ আর বর্তমান পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষা করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক কাটাছেঁড়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি যথাযথ নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। এনসিপির সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজগুলো সম্পন্ন করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তারা এখন থেকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা যেমন পাবেন, তেমনি জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতাও বহুগুণ বেড়ে গেল।
এদিকে, বিএনপির অনড় অবস্থানের বিপরীতে এনসিপি ও জামায়াতের এই অংশগ্রহণকে অনেকেই নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন। যদিও এনসিপি নেতারা দাবি করছেন, তাদের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সচল রাখার স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর চাপে তারা এই সিদ্ধান্ত নেননি বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলের দিকে সংসদ ভবন এলাকা থেকে যখন এনসিপির সদস্যরা বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের ঘিরে ছিল সংবাদকর্মীদের ভিড়। যদিও অধিকাংশ সদস্যই তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাদের চোখে ছিল আগামী দিনের সংসদীয় লড়াইয়ের প্রস্তুতি। সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা এখন দেখার বিষয়।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে এই শপথ গ্রহণ অনেকটা তপ্ত রোদে মেঘের ছায়ার মতো। অন্তত সংসদের আসনগুলো পূর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলছে। তবে বড় দলগুলোর মধ্যে যে আস্থার সংকট রয়েছে, তা এই ক্ষুদ্র দলগুলোর শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে কতটা মিটবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
এনসিপির এই ছয়জন সদস্য এখন থেকে কেবল তাদের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি নন, বরং জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হয়ে থাকলেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদে তাদের ভূমিকা কী হবে এবং তারা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কতটা তুলে ধরতে পারবেন, রাজনৈতিক বোদ্ধারা এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন।

