নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে এখন সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রহর। ঠিক এমন এক মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সমীকরণ স্পষ্ট করলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দিল্লির সঙ্গে কোনো সামরিক সংঘাত নয়, বরং ঝুলে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে আলোচনার মাধ্যমেই।
ফখরুল অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব না। যারা যুদ্ধের কথা বলেন, তারা আসলে পাগলের মতো কথা বলেন।” তার এই বক্তব্যকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যখন সীমান্ত হত্যা এবং পানি বন্টনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে, তখন হবু সরকারের অন্যতম শীর্ষ নেতার এমন বাস্তববাদী অবস্থান এক ধরনের কূটনৈতিক পরিপক্বতারই ইঙ্গিত দেয়।
সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল আগামী দিনে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোও চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আগামী বছরের মধ্যেই গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, যেখানে ফারাক্কা বাঁধের ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বেদনাদায়ক বিষয়টি নিয়েও দিল্লির সঙ্গে জোরালো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিএনপি মহাসচিবের মতে, যুদ্ধের হুঙ্কার দিয়ে কোনো দেশের সঙ্গে টেকসই সম্পর্ক গড়া সম্ভব নয়। বরং যুক্তিনির্ভর এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। তার ভাষায়, “আমাদের অবশ্যই এই বিষয়গুলো নিয়ে টেবিলে বসতে হবে। সংঘাত কোনো বিকল্প হতে পারে না।”
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে মির্জা ফখরুল বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে ‘জাতীয় পুনর্মিলন’ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফখরুলের অভিযোগ, ড. ইউনূস অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের প্রভাবের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
উল্লেখ্য, আগামীকাল মঙ্গলবারই নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। সরকার গঠনের ঠিক আগমুহূর্তে মির্জা ফখরুলের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে দিল্লিতে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকার ক্ষমতার অলিন্দে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বৈরিতার বদলে স্থিতিশীল বন্ধুত্বই বিএনপির কাম্য—ফখরুলের কথায় যেন সেই সুরই প্রতিধ্বনিত হলো।
এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার গঠনের পর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে দিল্লি কতটুকু আন্তরিকভাবে ঢাকার পাশে দাঁড়ায়।

