ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর দেশবাসীর উদ্দেশে প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই জয়কে কোনো বিশেষ দলের নয়, বরং সাধারণ মানুষের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় এদেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের। আজ থেকে আমরা সবাই সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন।”
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এই আনন্দের মাঝেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের কথা। ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংস্কার করাই হবে তাঁর সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির ডাক দেন। তিনি দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “নির্বাচনী লড়াইয়ে কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সেই রেশ যেন প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়। কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বরদাশত করা হবে না। মনে রাখবেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের সব লড়াই বৃথা হয়ে যাবে।” তিনি স্পষ্ট জানান, অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে নিজ দলের কর্মীদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যই হবে আগামী দিনের চালিকাশক্তি। মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। তারেক রহমানের মতে, সরকার ও বিরোধী দল যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
নতুন সরকার পরিচালনার দর্শন নিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি তার ঘোষিত ৩১ দফা এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করাই হবে তাঁর প্রশাসনের মূল অগ্রাধিকার। তিনি আরও জানান, কোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ দেওয়া হবে না, বরং সবার জন্য সমান ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তাঁর নির্বাচনী কৌশল বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ সম্পর্কে বলেন, “জনগণকে কনভেন্স করা বা তাঁদের মন জয় করাই ছিল আমাদের আসল ইঞ্জিনিয়ারিং। আমরা সেখানে সফল হয়েছি।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁদের সক্রিয় ভূমিকার কারণেই একটি স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব হয়েছে।
বক্তব্যের শেষ দিকে তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, “যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আজ কথা বলছি, তাঁদের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।” এ সময় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ লড়াই ও আপসহীন নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
শান্তিপূর্ণভাবে বিজয় উদযাপন করার নির্দেশ দিয়ে তিনি নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বলেন, “বিজয় মানে দম্ভ নয়, বিজয় মানে দায়িত্ব। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি যেখানে প্রতিটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকবে এবং যেখানে বিচার হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে।”

