ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনি দাবি করে অন্তত ৩০টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, এসব আসনে পরিকল্পিতভাবে কারচুপি, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে মগবাজারে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এই অভিযোগ করেন।
জুবায়ের বলেন, “একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দেশবাসী স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশায় ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অনেক কেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভোট গণনার সময় যে ধরণের রাখঢাক ও গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে, তা নির্বাচনী স্বচ্ছতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, কিছু আসনে গভীর রাতে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে এবং ভোর ৫টার দিকে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যেসব আসনে জামায়াত প্রার্থীদের পরাজয়ের ব্যবধান ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ভোটের মধ্যে, মূলত সেই আসনগুলোতেই ব্যাপক অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। জামায়াতের দাবি, এসব আসনে প্রাপ্ত ভোটের তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে। দলটির আইনজীবী প্যানেল ইতিমধ্যেই প্রতিটি বিতর্কিত আসনের জন্য পৃথকভাবে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জমা দিয়েছে। জুবায়ের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি কমিশন দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে আমরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হবো এবং রাজপথেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ে তুলবো।”
ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী ডা. আব্দুল মান্নান সংবাদ সম্মেলনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য ও প্রমাণ হাজির করেন। তিনি কয়েকটি কেন্দ্রের হাতে লেখা ফলাফলের শিট দেখিয়ে বলেন, “নির্বাচন কমিশনের যেখানে ডিজিটাল এবং নির্ভুল তথ্য দেওয়ার কথা, সেখানে পেন্সিল দিয়ে লেখা কাটাকাটি করা শিট আমাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর নেই, আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাদের এজেন্টের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।” তিনি জানান, নির্বাচনের রাতেই এসব অনিয়মের প্রতিকার চেয়েও প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ভোটের ফলাফল পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা নতুন বাংলাদেশে কাম্য নয়। তিনি বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম বড় দলগুলো সংযত আচরণ করবে, কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় বিজয়োল্লাসের নামে প্রতিশোধমূলক রাজনীতি শুরু হয়েছে।” তিনি অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
জুবায়ের দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমরা নির্বাচন বর্জন করছি না বা পুরো ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি না। আমরা কেবল জনগণের আমানত রক্ষার স্বার্থে বিতর্কিত আসনগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, নিরপেক্ষভাবে পুনর্গণনা করা হলে যাদের আজ পরাজিত দেখানো হয়েছে, তাদের অনেকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ফিরবেন।”
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এবং অন্যান্য আইনজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের এই কঠোর অবস্থানের ফলে নবনির্বাচিত সংসদের গেজেট প্রকাশের পরও বেশ কিছু আসনের ভাগ্য নিয়ে আইনি টানাপোড়েন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

