বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বরাবরই নিজেদের পেশাদারিত্বের দাবি করে এলেও মাঠের বাইরের কিছু কর্মকাণ্ড সেই দাবিকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এবার নারী এশিয়া কাপের মতো ঐতিহাসিক এক আসরে বাংলাদেশের অভিষেকের আগেই তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। ফেডারেশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে চূড়ান্ত স্কোয়াডের তালিকা, যা নিয়ে তোলপাড় চলছে দেশের ফুটবলাঙ্গনে।
ঐতিহাসিক এই টুর্নামেন্টের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল এবং কোচিং স্টাফের তালিকা গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এই তালিকায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগেই কীভাবে এই গোপনীয় তথ্য বাইরে এল, তা নিয়ে খোদ ফেডারেশনের ভেতরেই কানাঘুষা শুরু হয়েছে। তবে এটিই প্রথম নয়, ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দল ‘ফাঁস’ হওয়া যেন বাফুফের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। সাধারণত যে কোনো বিদেশ সফরের আগে সরকারি আদেশের (জিও) জন্য ফেডারেশনগুলোকে এনএসসিতে আবেদন করতে হয়। বাফুফেও অস্ট্রেলিয়া এশিয়া কাপের জন্য আবেদন করেছে। তবে এবারের তালিকায় কিছু অদ্ভুত সিদ্ধান্ত ও দল নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনএসসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বাফুফের কাছে খেলোয়াড় বাছাইয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছিলেন, কিন্তু কোচের দোহাই দিয়ে ফেডারেশন সেই তথ্য এড়িয়ে গেছে।
ফাঁস হওয়া তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক সুইডেন প্রবাসী ফুটবলার আনিকার অন্তর্ভুক্তি। আনিকা যখন ঢাকায় ট্রায়াল দিতে এসেছিলেন, তখন কোচ বাটলার অ-১৯ দল নিয়ে নেপালে ছিলেন। মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময় ঢাকায় কাটিয়ে আনিকা ফিরে যান। প্রশ্ন উঠেছে, সরাসরি না দেখে বাটলার কীভাবে তাকে চূড়ান্ত স্কোয়াডে রাখলেন? অথচ দেশের নারী ফুটবলের সাফল্যের কারিগর সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রাণী সরকার বা মাসুরা পারভীনের মতো পরীক্ষিত তারকাদের পরখ করার ন্যূনতম প্রয়োজন বোধ করেননি এই ব্রিটিশ কোচ।
অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সঙ্গে পিটার বাটলারের দূরত্ব এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। গত এক বছর ধরে দলের বাইরে থাকা এই ফুটবলাররা ভুটান লিগ ও সাফ ফুটসালে নিজেদের ফিটনেস ও ফর্মের প্রমাণ দিলেও কোচের নেকনজরে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এশিয়া কাপের মতো বড় আসরে যেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে, সেখানে দলের স্বার্থের চেয়ে কোচ নিজের ব্যক্তিগত ‘ইগো’ বা অহমকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। আর বাফুফেও কোচের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে এতে মৌন সমর্থন দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর এনএসসি থেকে একটি লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যে, যে কোনো বিদেশ সফরের ফ্লাইটের অন্তত দশ দিন আগে খেলোয়াড় নির্বাচনের দালিলিক প্রমাণসহ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। বাফুফে সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৌখিকভাবে চাওয়ার পরেও তারা এনএসসিকে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের বিস্তারিত ডেটা বা নির্বাচনের যৌক্তিকতা সরবরাহ করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাফুফের এই অপেশাদার আচরণ কেবল খেলোয়াড়দের মনোবলই ভাঙছে না, বরং বিশ্বমঞ্চে দেশের ফুটবল ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। যেখানে প্রথমবারের মতো এশিয়ার বড় আসরে লড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, সেখানে বাফুফে এখন ব্যস্ত দল ফাঁসের দায় এড়াতে আর অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতে। বাফুফের নতুন নেতৃত্ব এই অচলাবস্থা কাটিয়ে কীভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

