বাংলাদেশের ক্রিকেটের ঝকঝকে আকাশের নিচে যে অন্ধকারের বীজ রোপণ করা হয়েছিল, সেই ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিষদাঁত ভাঙতে এবার কঠোর অবস্থানে নামল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর একজন ক্রিকেটারসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বহুদিন ধরে চলা রহস্য আর ধোঁয়াশার পর্দা সরিয়ে আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিসিবি জানিয়েছে, তাদের ইনটেগ্রিটি ইউনিটের (বিসিবিআইইউ) দীর্ঘ তদন্তে দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটার, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক এবং দলের ব্যবস্থাপক।
তদন্ত শেষে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তারা হলেন ঘরোয়া ক্রিকেটার অমিত মজুমদার, ফ্র্যাঞ্চাইজি সহ-মালিক মো. তৌহিদুল হক তৌহিদ এবং দুই টিম ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান ও রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার দায়ে সামিনুর রহমান নামে আরও একজনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের পথে হাঁটছে বোর্ড।
বিসিবির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তদের কাছে অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবেন। তবে চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। বিসিবি আপাতত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
২০২৫ সালের বিপিএল আসরটি চলাকালীনই যখন ফিক্সিংয়ের গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করে, তখন ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেন। প্রায় এক বছরের নিবিড় অনুসন্ধানের পর কমিটি বিসিবির কাছে ৯০০ পৃষ্ঠার এক বিশাল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনটি পরবর্তীকালে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয় বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের প্রধান অ্যালেক্স মার্শালের কাছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দুর্নীতি বিরোধী বিধিমালার আলোকে প্রাপ্ত প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে এই পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কেবল সরাসরি ফিক্সিং নয়, বরং তথ্য গোপন এবং তদন্ত কাজে অসহযোগিতাও ছিল অপরাধের অন্যতম অংশ।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। ক্রিকেটার অমিত মজুমদারের বিরুদ্ধে সরাসরি জুয়ায় লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইসিসি কোডের ২.২.১ ধারা অনুযায়ী, কোনো ম্যাচের ফলাফল বা অগ্রগতির ওপর বাজি ধরা বা বাজি গ্রহণ করার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একজন পেশাদার ক্রিকেটারের এমন কাজ দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধরনের লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্র্যাঞ্চাইজি সহ-মালিক তৌহিদুল হক তৌহিদ এবং ম্যানেজার লাবলুর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্তে অসহযোগিতা এবং তথ্যপ্রমাণ ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ড্যাকোর (DACO) তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল যোগাযোগ ও তথ্য মুছে ফেলেছেন। অনুচ্ছেদ ২.৪.৬ এবং ২.৪.৭ লঙ্ঘনের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরেক ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও সরাসরি বাজিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ক্রিকেটের মতো জেন্টলম্যানস গেমে যারা নেপথ্যে কারিগর হিসেবে থাকেন, তাদের এমন কর্মকাণ্ডে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ওপর মানুষের আস্থা যে বড় ধরনের সংকটে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে সামিনুর রহমানের বিষয়ে। বিসিবির তদন্ত বলছে, সামিনুর কেবল একটি আসর নয়, বরং বিপিএলের ৯ম, ১০ম এবং ১১তম আসরেও দুর্নীতির জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। তিনি দেশি-বিদেশি বেটিং সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশ করে খেলোয়াড় ও এজেন্টদের অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। তার বিরুদ্ধে ‘বিসিবি এক্সক্লুডেড পারসন পলিসি’র আওতায় বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়েছে।
বিসিবির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, গত বিপিএল নিলামে এনামুল হক বিজয় বা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের মতো তারকা ক্রিকেটারদের রাখা হয়নি মূলত সন্দেহের তালিকার ওপর ভিত্তি করেই। যদিও চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্টে অনেক বড় নামের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি, তবে বিসিবি কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই বোর্ড ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে।
আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী কোড বা বিধিমালার লঙ্ঘন বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন করায় নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিলেন। তবে এবার যে মাত্রায় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ও কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়েছে, তাতে বিপিএলের কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিকের মতে, “বিপিএলকে ঘিরে যখন জুয়াড়িরা সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন কেবল ক্রিকেটারদের নিষিদ্ধ করলেই হবে না। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের মালিকানা এবং তাদের নেপথ্য কার্যক্রমের ওপরও কড়া নজরদারি দরকার। বিসিবির এবারের এই ৯০০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট অন্তত একটি বার্তা দিচ্ছে—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
দেশের সাধারণ ক্রিকেট সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে বলছেন, যারা ক্রিকেটের গায়ে কালিমা লেপন করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত যেন ভবিষ্যতে কেউ আর এমন দুঃসাহস না দেখায়। আবার অনেকে মনে করেন, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় মূল হোতারা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়।
বিসিবির ইনটেগ্রিটি ইউনিট জানিয়েছে, এবারের তদন্তে তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং ফরেনসিক ডেটা ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে মুছে ফেলা মেসেজ ও কল রেকর্ড পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অভিযুক্তদের সাথে বাজিকরদের যোগাযোগের প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি বিসিবির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধিরও একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্রিকেট বোর্ড আপাতত ১৪ দিনের ডেডলাইন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। অভিযুক্তরা যদি এই সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারেন, তবে তাদের ওপর কয়েক বছর থেকে শুরু করে আজীবন নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া নামতে পারে। বিসিবি চাইছে, আগামী বিপিএল আসরের আগেই দুর্নীতির এই জঞ্জাল পুরোপুরি পরিষ্কার করতে।
বিশ্ব ক্রিকেটের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যখন উজ্জ্বল হচ্ছে, তখন বিপিএলের মতো ঘরোয়া টুর্নামেন্টে এমন বিচ্যুতি অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তবে বোর্ড যেভাবে ৯০০ পৃষ্ঠার রিপোর্ট তৈরি করে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা বিপিএলকে কলঙ্কমুক্ত করার প্রথম ধাপ হতে পারে। ক্রিকেটের শুদ্ধি অভিযানে এই নিষেধাজ্ঞা কেবল শুরু মাত্র।
পরিশেষে, ক্রিকেটের মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই যখন ভক্তদের রোমাঞ্চিত করে, তখন ড্রেসিংরুম বা মাঠের বাইরের এমন নোংরা খেলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ক্রিকেট ভক্তদের প্রত্যাশা—অমিত মজুমদার বা লাবলুর রহমানদের মতো মানুষেরা যেন আর কখনোই ২২ গজে ফেরার সুযোগ না পান। বাংলাদেশের ক্রিকেট হোক স্বচ্ছ, সুন্দর এবং ফিক্সিং মুক্ত।

