মিরপুরের গ্যালারিতে তখন গগনবিদারী চিৎকার। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের মন্থর উইকেটে আজ যেন আগুন ঝরালেন এক তরুণ তুর্কি। নাহিদ রানার গতির ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ। ১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে মাঠ ছাড়ল নাজমুল হাসান শান্তর দল।
এই জয় কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক নতুন যুগের সূচনা। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের টানা তৃতীয় বা ‘হ্যাটট্রিক’ টেস্ট জয়। রাওয়ালপিন্ডির সেই ঐতিহাসিক সিরিজের পর এবার ঘরের মাঠেও আধিপত্য বজায় রাখল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
২৬৮ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান শুরুতেই টালমাটাল হয়ে পড়ে। ইনিংসের প্রথম ওভারেই আঘাত হানেন অভিজ্ঞ তাসকিন আহমেদ। তার দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে কিপারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ইমাম-উল হক। মাত্র ২ রানে প্রথম উইকেট হারিয়েই চাপে পড়ে সফরকারীরা।
আজান আওয়াইস এবং অধিনায়ক শান মাসুদ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের আঁটসাঁট বোলিংয়ের সামনে তারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। আজান ১৫ রান করে ফিরলেও শান মাসুদ ২ রানের বেশি এগোতে পারেননি। ৬৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল পাকিস্তান।
চতুর্থ উইকেটে আব্দুল্লাহ ফজল এবং সালমান আগা কিছুটা আশা জাগিয়েছিলেন। তাদের ৫১ রানের জুটি যখন বাংলাদেশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন তাইজুল ইসলাম। ৬৬ রান করা ফজলকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে জুটি ভাঙেন এই বাঁহাতি স্পিনার।
ফজলের বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও হানা দেন তাসকিন। এবার তাঁর শিকার ২৬ রান করা সালমান আগা। ১১৯ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তখন খাদের কিনারে। উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং সৌদ শাকিল হাল ধরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখনো নাহিদ রানার তান্ডব বাকি ছিল।
নিজের টানা দুই ওভারে রিজওয়ান ও শাকিলকে সাজঘরে ফেরান নাহিদ। দুজনের ব্যাট থেকেই আসে সমান ১৫ রান। এরপর হাসান আলিকে ফিরিয়ে উইকেট উৎসবে যোগ দেন তাইজুল। ১৬৩ রানেই থমকে যায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস। বাংলাদেশের বোলারদের দাপটে অসহায় আত্মসমর্পণ করে বাবর আজমের উত্তরসূরিরা।
নাহিদ রানা আজ মিরপুরের আকাশে ধুমকেতুর মতো উদিত হলেন। মাত্র ৪০ রান খরচায় তুলে নিলেন ৫টি উইকেট। গতির সাথে সুইংয়ের মিশেলে পাকিস্তানি ব্যাটারদের কোনো সুযোগই দেননি তিনি। এটি টেস্ট ক্রিকেটে এই তরুণ পেসারের প্রথম ‘ফাইফার’, যা নিশ্চিতভাবেই অনেকদিন মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব।
তাসকিন আহমেদ এবং তাইজুল ইসলাম দুটি করে উইকেট নিয়ে নাহিদকে যোগ্য সহায়তা দিয়েছেন। অফ-স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ পেয়েছেন একটি উইকেট। বোলারদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই মূলত জয়ের পথ মসৃণ করে দিয়েছে। শান্তর অধিনায়কত্বে ফিল্ডিং সাজানো এবং বোলিং পরিবর্তনও ছিল দেখার মতো।
ম্যাচের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রান করে এক মজবুত ভিত্তি গড়েছিল। নাজমুল হোসেন শান্তর অনবদ্য সেঞ্চুরি এবং মুমিনুল-মুশফিকের হাফ-সেঞ্চুরি ছিল সেই ইনিংসের প্রাণ। জবাবে আজান আওয়াইসের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তান ৩৮৬ রান করলে লিড দাঁড়ায় মাত্র ২৭ রান।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। অধিনায়ক শান্তর ৮৭ এবং মুমিনুল হকের ৫৬ রান দলের পুঁজি বড় করতে সাহায্য করে। পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রান। পঞ্চম দিনের শুরুতে শান্ত ও মুশফিক যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল লক্ষ্য আরও বড় হবে।
তবে মুশফিক ২২ এবং লিটন দাস ১১ রানে আউট হলে দ্রুত রান তোলার তাড়ায় বাংলাদেশ ইনিংস ডিক্লেয়ার করে। মেহেদী মিরাজের ২৪ রানের ক্যামিও ইনিংসটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এবাদত হোসেন ৪ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান শুরু থেকেই ছিল ব্যাকফুটে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় পেতে বাংলাদেশের অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ ২৩ বছর। এই সময়ে টানা ১১টি হার হজম করতে হয়েছে টাইগারদের। কিন্তু ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে সেই গেরো খোলার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আজ মিরপুরের জয় সেই আধিপত্যকেই পূর্ণতা দিল।
ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। এর আগে মিরপুরের এই মাঠে বহুবার জয়ের কাছে গিয়েও হারতে হয়েছে। কিন্তু এবার আর কোনো ভুল করেনি শান্তর বাহিনী। কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মাঠের পারফরম্যান্স—সব বিভাগেই পাকিস্তান ছিল বাংলাদেশের তুলনায় ম্লান।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শান্তর চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। তিনি বলেন, “এটি দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। নাহিদ রানা যেভাবে আজ বল করেছে, তা অবিশ্বাস্য। আমাদের ব্যাটাররা প্রথম ইনিংসে বড় রান তুলে বোলারদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল। আমরা এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই।”
অন্যদিকে পাকিস্তানি অধিনায়ক শান মাসুদের কণ্ঠে ছিল একরাশ হতাশা। তিনি স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের স্পিনার এবং পেসাররা তাদের ওপর শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। বিশেষ করে নাহিদ রানার স্পেলটি ম্যাচ থেকে তাদের পুরোপুরি ছিটকে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই টেস্ট সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। এই জয়ের ফলে পয়েন্ট টেবিলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সংহত হলো। বড় দলগুলোর বিপক্ষে ঘরের মাঠে জয়ের যে অভ্যাস বাংলাদেশ গড়ে তুলছে, তা বিশ্ব ক্রিকেটে তাদের সমীহ বাড়াবে।
মিরপুরের পিচ নিয়ে বরাবরই আলোচনা থাকে। তবে পঞ্চম দিনের উইকেট যেভাবে ব্যাটার ও বোলার উভয়ের জন্যই সমান সুযোগ রেখেছিল, তার প্রশংসা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ দলের পরিকল্পনা ছিল ধৈর্য ধরা এবং সঠিক জায়গায় বল করা। বোলাররা ঠিক সেই কাজটিই করেছেন নিখুঁতভাবে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ রানার মতো একজন খাঁটি ফাস্ট বোলার পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি। সাধারণত বাংলাদেশের পেসাররা লাইন-লেংথ বজায় রাখলেও নাহিদের মতো বাড়তি গতি খুব কম বোলারই দিতে পারেন। আজ পাকিস্তানের ব্যাটাররা মূলত গতির কাছেই পরাস্ত হয়েছেন।
শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলেন। সাদা পোশাকে বাংলাদেশের এমন দাপুটে জয় খুব কমই দেখা গেছে। এই জয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। পরের ম্যাচেও এই জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চাইবে টাইগাররা।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক সময় টেস্ট ম্যাচ মানেই ছিল হার বাঁচানোর লড়াই। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বাংলাদেশ কেবল লড়ে না, জয়ের মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে। পাকিস্তানের মতো বিশ্বসেরা পেস আক্রমণের দলকে ১০৪ রানে হারানো কোনো ছোটখাটো অর্জন নয়।
এই জয়ের প্রভাব পড়বে দেশের তৃণমূল ক্রিকেটেও। নাহিদ রানার মতো তরুণদের পারফরম্যান্স দেখে অনুপ্রাণিত হবে আগামীর পেসাররা। নির্বাচক প্যানেল এবং কোচিং স্টাফদের ওপরও আস্থার জায়গাটি আরও শক্ত হলো এই হ্যাটট্রিক জয়ের মধ্য দিয়ে।
সামগ্রিকভাবে মিরপুর টেস্ট ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক সোনালী অধ্যায়। ব্যাটিংয়ের দৃঢ়তা, বোলিংয়ের আগ্রাসন আর ফিল্ডিংয়ের চপলতা—সব মিলিয়ে এক কমপ্লিট প্যাকেজ উপহার দিল টিম বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই হ্যাটট্রিক জয়টি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
বিকেলের সূর্য যখন ডুবু ডুবু, তখন মাঠের মাঝখানে বাংলাদেশের পতাকাবাহী ল্যাপ অব অনারটি ছিল দেখার মতো। গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগান যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, ঘরের মাঠে বাঘেরা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। পাকিস্তানের দর্প চূর্ণ করে বিজয়ের উল্লাসে মাতল গোটা দেশ।
আগামী টেস্টেও যদি বাংলাদেশ এই ছন্দ ধরে রাখতে পারে, তবে সিরিজ জয় কেবল সময়ের ব্যাপার। বর্তমান দলের যে আত্মবিশ্বাস, তাতে বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তিকে হারিয়ে দেওয়া এখন অসম্ভব কিছু নয়। মিরপুরের জয় কেবল একটি শুরু মাত্র, লক্ষ্যের সীমানা এখন আরও বহুদূরে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই বসন্তকাল যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়। টেস্ট ক্রিকেটের আভিজাত্য বজায় রেখে শান্ত, মুমিনুল আর নাহিদ রানারা যেভাবে দেশকে সম্মান এনে দিচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকুক। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই গৌরবময় হ্যাটট্রিক জয়টি যেন আগামীর বড় বড় সাফল্যের পথে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।

