চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দান আবারও সাক্ষী হলো রাজনৈতিক উত্তাপের। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত রাজপথের লড়াই চলমান থাকবে। তার মতে, চলমান এই গণআন্দোলন কেবল তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন ভোটের ফলাফলে জনগণের প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে।
সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের সমর্থনে আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বিগত বছরগুলোর ত্যাগ ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আন্দোলন এখনো শেষ হয়নি। আমাদের নেতা-কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে গুম, খুন এবং অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরিবারগুলো লাঞ্ছিত হয়েছে, আমাদের ভাইরা জেলখানায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।”
খসরু অভিযোগ করেন, প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলার বোঝা বইতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ ধানক্ষেত আর বেড়িবাঁধে রাত কাটিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই দীর্ঘ লড়াই কি কেবল ক্ষমতার জন্য? না, এই আন্দোলন ছিল মানুষের সাংবিধানিক অধিকার এবং হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। তার ভাষায়, জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়াই এই সংগ্রামের মূল লক্ষ্য।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে নেতা-কর্মীদের কঠোর দিকনির্দেশনা দেন। খসরু বলেন, “এই আন্দোলনের শেষ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে। যখন ভোট গণনা শেষে বিজয়ের খবর সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছাবে, তখনই হবে বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তি।” আগামী কয়েক দিন দলীয় কর্মীদের ‘জাগ্রত সৈনিক’ হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে আমীর খসরু বলেন, যারা সরাসরি রাজনীতির মাঠে জনগণের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, তারা এখন পর্দার আড়ালে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভুয়া এনআইডি কার্ড, জাল ব্যালট পেপার এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভোট চুরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলীয় কর্মীদের চোখ-কান খোলা রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যেখানেই জালিয়াতির চেষ্টা হবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী আবু সুফিয়ানের দীর্ঘদিনের ত্যাগের কথা স্মরণ করে খসরু বলেন, “সুফিয়ান আমাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের বিশ্বস্ত সাথী। আমরা বারবার জেলে গিয়েছি কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে কখনো আপস করিনি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি কোনো প্রকার কারচুপির মাধ্যমে নয়, বরং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে জনগণের রায়কে সম্মান জানাতে চায়।
জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে আবু সুফিয়ান তার বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সুর ফুটিয়ে তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা বিজয়ের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি আসনের নয়, বরং এটি হবে সারা দেশের মানুষের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ফয়সালা।” এই বিজয়কে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের আদর্শের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াছিন চৌধুরী লিটন।
বক্তারা সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়া এবং যেকোনো ধরনের কারচুপি রুখে দেওয়ার শপথ নেন। লালদিঘীর এই জনসভা থেকে মূলত নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পাশাপাশি চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি হিসেবে নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।

