দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য এক গভীর উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে ভারতের এমন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বেশ বিরল। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো—বিগত দেড় দশক পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় এমন এক নতুন বাস্তবতার উদয় হতে যাচ্ছে, যেখানে তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব কার্যত অনুপস্থিত।
দিল্লির কূটনীতিকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে মানিয়ে নিতে ভারতকে এখন থেকেই প্রস্তুতি সারতে হচ্ছে। বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে, নাকি জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে জোট সরকার গঠন করবে—এই সমীকরণটিই এখন ভারতের প্রধান মাথাব্যথার কারণ।
অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার সমীকরণ
ভারতের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে উলফা বা এনএসবিএনের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের মাটিতে কোনো আশ্রয় পায়নি। অনুপ চেটিয়া বা অরবিন্দ রাজখোয়ার মতো শীর্ষ নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দিয়ে ঢাকা যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল, নতুন সরকার সেই অবস্থানে অটল থাকবে কি না—সেটিই দিল্লির প্রধান দুশ্চিন্তা।
দিল্লির মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের (আইডিএসএ) সিনিয়র ফেলো স্মৃতি পট্টনায়ক বিবিসিকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত কোনো আপস করবে না। এমনকি বাংলাদেশের নতুন সরকার যদি পাকিস্তানের সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাতেও দিল্লির আপত্তি নেই; যদি না সেটি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থে আঘাত হানে।
বিএনপি ও জামায়াত: বদলাচ্ছে কি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি?
এক সময় বিএনপিকে ভারত-বিরোধী রাজনীতির সমার্থক হিসেবে দেখা হলেও, গত এক বছরে দিল্লির মনোভাব অনেকটাই বদলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শ্রীপর্ণা পাঠকের মতে, ভারত বর্তমানে বিএনপিকে একটি ‘স্টেবল’ বা স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখছে এবং তাদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করেছে। এমনকি খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় নরেন্দ্র মোদির সহমর্মিতা প্রকাশকে একটি ‘ওপেন আউটরিচ’ বা খোলামেলা যোগাযোগের সূচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর সাথে ভারতের কথিত গোপন যোগাযোগ। এক সময় যাদের ‘রেড লাইন’ বা নিষিদ্ধ সীমানা হিসেবে গণ্য করা হতো, সেই জামায়াত নেতৃত্বের সাথে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সৌজন্য সাক্ষাতের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে চাউর হয়েছে। ভারতের সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতে, প্রতিবেশীকে বদলানো যায় না। তাই বাস্তবতার খাতিরেই জামায়াত যদি পরবর্তী সরকারের অংশ হয়, তবে ভারত তাদের সাথে ‘বিজনেস’ করতে প্রস্তুত থাকবে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ভারতের শিক্ষা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে তীব্র ভারত-বিরোধী স্লোগান উঠেছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই এবার ভারত বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিজেদের দৃশ্যত দূরে রেখেছে। এমনকি আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাল, তখনো দিল্লির দিক থেকে কোনো রুটিন প্রতিবাদ আসেনি। ভারত এখন চায় বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার আসুক, যা এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।
ভারতের কাছে এখন মুখ্য বিষয় হলো স্থিতিশীলতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির পর ঢাকায় এমন একটি শক্তি ক্ষমতায় আসুক, যাদের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা সম্ভব। দিল্লির পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় আসুক, তারা যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো আমলে নেয়, তবে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে দিল্লির কোনো বাধা থাকবে না।

