বাংলাদেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জাতির উদ্দেশে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “নাগরিককে দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না।” তার এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা জনগণের ক্ষমতায়ন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর এক গভীর দর্শন হিসেবে দেখছেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেওয়া এই ভাষণে তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার শপথ পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের গণতন্ত্র (Democracy), উন্নয়ন (Development) কিংবা বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization)—কোনো কিছুই টেকসই হবে না।
তারেক রহমান তার ভাষণে আগামীর সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এক গুচ্ছ অঙ্গীকার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় আপনাদের সমর্থন পেলে আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায়, বিএনপি সরকার ইনশাআল্লাহ ততটাই কঠোর হবে।” তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন যে, দেশে পুনরায় আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং আইন চলবে তার নিজস্ব গতিতে।
কেবল তাত্ত্বিক বুলি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিএনপির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন দলটির চেয়ারম্যান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী এবং তাদের উন্নয়নযাত্রায় শামিল না করলে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। এ লক্ষ্যে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন, যার মাধ্যমে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণীদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নেও বড় ঘোষণা দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি জানান, বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও বেকারত্ব দূর করতে আগামী ৫ বছরে দেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তারেক রহমান তার ভাষণে ঢাকাকে একটি ‘নিরাপদ শহর’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখান। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক শহর চাই যেখানে মা-বোনেরা মাঝরাতেও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন।” এ লক্ষ্যে রাজধানীতে অন্তত ৪০টি নতুন খেলার মাঠ নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তার পরিকল্পনায়।
রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি না ভেবে একে জনসেবার মাধ্যম হিসেবে দেখার আহ্বান জানান বিএনপি প্রধান। তিনি বলেন, গত দেড় দশকের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে একটি মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই এখন সময়ের দাবি।
বক্তব্য শেষে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে দেশ গড়ার কারিগর হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তারেক রহমানের এই ভাষণ নির্বাচনী মাঠের উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সাধারণ ভোটারদের মনে সুশাসনের এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

