আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে আবারও বাজতে শুরু করেছে যুদ্ধের দামামা, তবে এবার তা সরাসরি রণক্ষেত্রে নয়, বরং শব্দের লড়াইয়ে। চীন গোপনে পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিস্ফোরক অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই মহাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। বেইজিং এই অভিযোগকে সরাসরি ‘নির্ভেজাল মিথ্যাচার’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছে, ওয়াশিংটন আসলে নিজের পারমাণবিক অস্ত্রাগারের আধুনিকায়ন আর নতুন পরীক্ষার অজুহাত খুঁজছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে মার্কিন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস ডিন্যানো এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে, ২০২০ সালের ২২ জুন চীন একটি শক্তিশালী পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ডিন্যানো অভিযোগ করেন, বেইজিং এই পরীক্ষা আড়াল করার জন্য ‘ডিকাপলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা ভূ-কম্পন মাপক যন্ত্রকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক কড়া বিবৃতিতে এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করা হয়। বেইজিং স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই গত অর্ধশতাব্দীর শৃঙ্খলা ভেঙে নতুন করে পরমাণু প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে।
ডিন্যানোর এই অভিযোগ এমন এক সময়ে এল, যখন মাত্র কয়েকদিন আগে—গত বৃহস্পতিবার—রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ছিল বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ আইনি দেয়াল। এই দেয়াল ধসে পড়ায় এখন মস্কো ও ওয়াশিংটন উভয়ই কোনো বাধা ছাড়াই নিজেদের পরমাণু ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। গত অক্টোবরে তিনি বলেছিলেন, চীন ও রাশিয়ার সাথে ‘সমতার ভিত্তিতে’ যুক্তরাষ্ট্রও পারমাণবিক পরীক্ষা শুরু করতে পারে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময় বা পদ্ধতির কথা বলেননি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডিন্যানোর অভিযোগ সেই পথকেই প্রশস্ত করছে।
অন্যদিকে, জেনেভায় ডিন্যানো যখন অভিযোগ তুলছিলেন, তখন তিনি একটি নতুন ত্রিপাক্ষিক চুক্তির রূপরেখাও দিচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, নতুন যেকোনো নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে যেন রাশিয়া ছাড়াও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু বেইজিং সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আপাতত কোনো প্রকার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় যোগ দিতে আগ্রহী নয়। তাদের মতে, ওয়াশিংটনের বর্তমান আচরণ ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো অবশ্য এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নারাজ। সিটিবিটিও (CTBTO)-র মতো বৈশ্বিক মনিটরিং ব্যবস্থা ২০২০ সালের সেই নির্দিষ্ট দিনে কোনো অস্বাভাবিক ভূ-কম্পন শনাক্ত করতে পারেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন কোনো শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্য আছে কি না যা বিশ্ব এখনো জানে না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান এবং চীনের গোপন পরীক্ষার অভিযোগ বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসী এখন শঙ্কিত—একবিংশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ লড়াই কি শেষ পর্যন্ত এক বিধ্বংসী পরমাণু প্রতিযোগিতার দিকে মোড় নেবে? বেইজিং ও ওয়াশিংটনের এই বাগযুদ্ধ কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং তা আগামীর বিশ্ব নিরাপত্তার এক অশনিসংকেত।

